সর্বশেষ খবর
Home / Uncategorized / চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম মহা-দার্শনিক ইবনে সিনা

চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম মহা-দার্শনিক ইবনে সিনা

লায়ন ডাঃ বরুণ কুমার আচার্য বলাই

প্রকাশ : 26.02.19, সময় : 5.30 pm

 
চিকিৎসা হল মানুষ বেঁচে থাকার এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। জন্মিলে মরিতে হইবে কিন্তু রোগে-ভোগে মৃত্যু কারো কাছে কাম্য নয়, তাই সুস্থতার প্রয়োজনে আমরা প্রতিনিয়ত ছুটে চলি চিকিৎসাসেবা নিতে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস মানবেতিহাসের ন্যায় প্রাচীন। সুদূর অতীতে মানব প্রজাতির বিকাশের সাথে সাথেই চিকিৎসাবিদ্যাও বিকশিত হয়েছে। ১ম সহস্রাব্দের দিকে প্রাচীন হিব্রু চিকিৎসা পদ্বতির অধিকাংশই তওরাত থেকে আসে । যেমন মুসা (আ) এর পাঁচটি বই, যা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আইন এবং রীতিনীতিগুলি ধারণ করে। আধুনিক ঔষধের উন্নয়নে হিব্রুদের অবদান বাইজেন্টাইন যুগে শুরু হয়েছিল ইহুদি চিকিৎসক আসফ এর মাধ্যমে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ঔষধ হিসাবে উদ্ভিদ (herbalism), পশুর দেহের বিভিন্ন অংশ, এবং খনিজ পদার্থ ব্যবহার করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে পুরোহিত, shamans, বা চিকিৎসকরা এই উপকরণগুলিকে ঐন্দ্রজালিক পদার্থ হিসাবে ব্যবহার করতেন। সুপরিচিত কিছু আধ্যাত্মিক ব্যবস্থাসমূহের কথা বলা যায় যেমন, প্রাণবৈচিত্র্য (আত্মার অনিবার্য বস্তু সম্পর্কে ধারণা), আধ্যাত্মিকতা (দেবতাদের কাছে আপীল বা পূর্বপুরুষের আত্মার সাথে আলাপ করা); Shamanism (রহস্যময় ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তির পরিচিতি); এবং ভবিষ্যৎবাণী (জাদুর মাধ্যমে সত্যকে প্রাপ্তি)। চিকিৎসা নৃতত্ত্বের ক্ষেত্রগুলি মূলত স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির দ্বারা আমাদের সংস্কৃতি ও সমাজের চারপাশ কী করে সংগঠিত বা প্রভাবিত হয় এমন উপায়গুলি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখে। যিনি এই চিকিৎসা পদ্ধতির গোড়াপত্তন করেছিলেন তিনি হলেন মহা-দর্শনিক ইবনে সিনা। তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। যিনি কঠোর জ্ঞান সাধনা ও অধ্যাবসায়ের মধ্য দিয়ে কাটিয়ে ছিলেন সারাটা জীবন, এক রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেও ধনসম্পদ, ভোগ বিলাস ও প্রাচুর্যের মোহ যাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি, তিনি ছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের গৌরব ইবনে সিনা। তাঁর আসল নাম আবু আলী আল হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা। তিনি সাধারণত ইবনে সিনা, বু-আলী সিনা এবং আবু আলী সিনা নামেই অধিক পরিচিত। ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তুর্কীস্তানের বিখ্যাত শহর বোখারার নিকটবর্তী আফসানা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম সিতারা বিবি। পিতা আবদুল্লাহ ছিলেন খোরাসানের শাসনকর্তা। জন্মের কিছু কাল পরই তিনি ইবনে সিনাকে বোখারা নিয়ে আসেন এবং তাঁর লেখাপড়ার সুব্যবস্থা করেন। ছোট বেলা থেকেই তাঁর মধ্যে লুকিয়ে ছিল অসামান্য মেধা ও প্রতিভা। মাত্র ১০ বছর বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা মুখস্থ করে ফেলেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে সকল জ্ঞান তিনি লাভ করে ফেলেন। বিখ্যাত দার্শনিক আল না’তেলী’র নিকট এমন কোন জ্ঞান আর অবশিষ্ট ছিল না, যা তিনি ইবনে সিনাকে শিক্ষা দিতে পারবেন। এরপর তিনি ইবনে সিনাকে নিজের স্বাধীন মত গবেষণা দেন। এবার তিনি চিকিৎসা বিদ্যা সম্পর্কিত কিতাব সংগ্রহ করে গবেষণা করতে শুরু করেন। ইবনে সিনা তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, এমন বহু দিবারাত্রি অতিবাহিত হয়েছে যার মধ্যে তিনি ক্ষণিকের জন্যেও ঘুমাননি। কেবলমাত্র জ্ঞান সাধনার মধ্যেই ছিল তাঁর মনোনিবেশ। যদি কখনো কোন বিষয় তিনি বুঝতে না পারতেন কিংবা জটিল কোন বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতেন তখনই তিনি মসজিদে গিয়ে নফল নামাজ আদায় করতেন এবং সেজদায় পড়ে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে বলতেন, “হে আল্লাহ তুমি আমার জ্ঞানের দরজাকে খুলে দাও। জ্ঞান লাভ ছাড়া পৃথিবীতে আমার আর কোন কামনা নেই”। তারপর গৃহে এসে আবার গবেষণা শুরু করত। ক্লান্তিতে যখন ঘুমিয়ে পড়তেন তখন অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো স্বপ্নের ন্যায় তাঁর মনের মধ্যে ভাসতো এবং তাঁর জ্ঞানের দরজা যেন খুলে যেত। হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠেই সমস্যাগুলোর সমাধান পেয়ে যেতেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি চিকিৎসা বিদ্যায় ইন্দ্রজালের সৃষ্টি করে তাঁর বাদশাহকে সুস্থ করে তোলেন। বাদশাহ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁর জন্যে রাজ দরবারের কুতুবখানা উন্মুক্ত করে দেন। মাত্র অল্প কয়েকদিনে তিনি অসীম ধৈর্য ও একাগ্রতার সাথে কুতুবখানার সব কিতাব মুখস্থ করে ফেলেন। জ্ঞান বিজ্ঞানের এমন কোন বিষয় বাকি ছিল না যা তিনি জানেন না।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, গণিতশাস্ত্র, জ্যামিতি, ন্যায়শাস্ত্র, খোদতত্ত্ব, চিকিৎসা শাস্ত্র, কাব্য, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে অসীম জ্ঞানের অধিকারী হন। ২১ বছর বয়সে ‘আল মাজমুয়া’ নামক একটি বিশ্বকোষ রচনা করেন, যার মধ্যে গণিত শাস্ত্র ব্যতীত পূর্বের  সকল বিষয়াদি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ১০০১ খ্রিস্টাব্দে পিতা আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল ২২ বছর। নেমে আসে তার উপর রাজনৈতিক দুর্যোগ। তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন এবং পিতার ঘটলে ১০০৪ খ্রিঃ ইবনে সিনা খাওয়ারিজমে রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ সময়ে খাওয়ারিজমের বাদশাহ ছিলেন মামুন বিন মাহমুদ। ১০০৪-১০১০ খ্রিঃ পর্যন্ত তিনি খাওয়ারিজমে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করলেও তাঁর এ সুখ শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ইবনে সিনার সুখ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে গজনীর সুলতান মাহমুদ তাঁকে পেতে চাইলেন। কারণ মাহমুদ জ্ঞানী ব্যক্তিদের খুব ভালবাসতেন। তাঁদেরকে দেশ বিদেশ থেকে ডেকে এনে তাঁর শাহী দরবারের গৌরব বৃদ্ধি করতেন এবং তাদেরকে মণি-মুক্তা উপহার দিতেন। এতদুদ্দেশ্যে সুলতান মাহমুদ তার প্রধান শিল্পী আবু নসারের মাধ্যমে ইবনে সিনার ৪০ খানা প্রতিকৃতি তৈরি করে সমগ্র পারস্য ও এশিয়া মাইনরের রাজন্যবর্গের নিকট ছবিসহ পত্র পাঠিয়ে দিলেন যাতে তাঁরা ইবনে সিনাকে খুঁজে বের করার জন্যে দেশে বিদেশে সুলতান মাহমুদ লোক পাঠিয়ে দিলেন। এছাড়া তিনি খাওয়ারিজমের বাদশাহ মামুন বিন মাহমুদকে পরোক্ষভাবে এ নির্দেশ দিয়ে একটি পত্র পাঠালেন যে, তিনি যেন তাঁর দরবারের জ্ঞানী ব্যক্তিদের সুলতনা মাহমুদের দরবারে পাঠিয়ে দেন। আসলে অন্যান্য জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে ইবনে সিনাকে পাওয়াই ছিল তাঁর আসল উদ্দেশ্য। ইবনে সিনা ছিলেন স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদা সচেতন ব্যক্তি। ধন সম্পদের প্রতি তার কোন লোভ লালসা ছিল না; কেবলমাত্র জ্ঞান চর্চার প্রতিই ছিল তাঁর আসক্তি। তিনি নিজের স্বাধীনতা ও ইজ্জতকে অন্যের নিকট বিকিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না। অন্যায় ভাবে কারো কাছে মাথা নত করতে তিনি জানতেন না। এছাড়া বিনা যুক্তিতে কারো মতামতকে মেনে নিতেও রাজি ছিলেন না তিনি। এমনকি ধর্মের ব্যাপারেও তিনি যুক্তির সাহায্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। পরে তিনি গজনীতে যেতে রাজি হলেন না। অবশেষে তিনি যান রাও প্রদেশে। বিভিন্ন কিতাব লিখতে শুরু করেন। কিন্তু এখানেও তাঁর সুখ স্থায়ী হল না। তাঁর জ্ঞান সাধনা ও কিতাব রচনায় বিঘœ সৃষ্টি হয়। তারপর তিনি চলে যান প্রথমে কাজাতীন ও পরে হামাদান শহরে। এখানে এসেই তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আশ শেফা’ ও ‘আল কানুন’ লেখায় হাত দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ সময় হামাদানের বাদশাহ শামস-উদ-দৌলা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে ৪০ দিন চিকিৎসা করে তাঁকে মুমূর্ষ অবস্থা থেকে সুস্থ করে তোলেন।
শামস-উদ-দৌলার মৃত্যুর পর সময় ও ঘটনার প্রবাহে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে চলে যান ইস্পাহানে। এ সময়ে ইস্পাহানের শাসনকর্তা ছিলেন, আল-উদ-দৌলা। তিনি ইবনে সীনাকে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং তাঁর জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা করে দেন।  এখানে তিনি উদ্যত গতিতে জ্ঞান চর্চা শুরু করেন এবং বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আশা শেফা’ ও ‘আল কানুন’ এর অসমাপ্ত লেখা শেষ করেন। এ মনীষী পদার্থবিজ্ঞান, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, জ্যামিতি, গণিত, চিকিৎসা বিজ্ঞান, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় শতাধিক কিতাব রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে আল কানুন, আশ শেফা, আরযুযা ফিত তিব্ব, লিসানুল আরব, আল মজনু, আল মুবাদাউন মায়াদা, আল মুখতাসারুল আওসাত, আল আরাসাদুল কলিয়া উল্লেখযোগ্য। আল কানুন কিতাবটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক বিপ্লব এনে দিয়েছিল।
কারণ এত বিশাল গ্রন্থ সে যুগে অন্য কেউ রচনা করতে পারেনি। আল কানুন কিতাবটি ল্যাটিন, ইংরেজি, হিব্রু প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হয় এবং তৎকালীন ইউরোপের চিকিৎসা বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আল কানুন ৫টি বিশাল খণ্ডে বিভক্ত যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪ লক্ষাধিক। কিতাবটিতে শতাধিক জটিল রোগের কারণ, লক্ষণ ও পথ্যাদির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়। প্রকৃত পক্ষে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের তিনিই হলেন জনক। ‘আশ শেফা’ দর্শন শাস্ত্রের আর একটি অমূল্য গ্রন্থ, যা ২০ খণ্ডে বিভক্ত ছিল। এতে ইবনে সিনা রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রাণীতত্ত্ব ও উদ্ভিদ তত্ত্বসহ যাবতীয় বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তিনি মানুষের কল্যাণ ও জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি সাধনে আজীবন পরিশ্রম করেছেন এবং ভ্রমণ করেছেন জ্ঞানের সন্ধানে। তিনিই সর্বপ্রথম ‘মেনেনজাইটিস’ রোগটি সনাক্ত করেন। পানি ও ভূমির মাধ্যমে যে সকল রোগ ছড়ায় তা তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। সময় ও গতির সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের কথা তিনিই আবিষ্কার করেন। তিনি এ্যারিস্টটলের দর্শন ও ভালভাবে অধ্যয়ন করেন। কিন্তু এ্যারিস্টটলের কিছু কিছু মতবাদের সাথে তিনি একমত হলেও সকল মতবাদের সাথে তিনি একমত হতে পারেননি।
জীবন সায়াহ্নে ফিরে আসেন তিনি হামাদানে। অতিরিক্ত পরিশ্রমের দরুন তিনি আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন। একদিন তাঁর এক ভৃত্য ঔষধের সাথে আফিম মিশিয়ে দেয়। আফিমের বিষক্রিয়ায় তার জীবনী শক্তি শেষ হয়ে আসে। ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দে মহাজ্ঞানী ও বিশ্ববিখ্যাত এ মনীষী শেষ নিঃশাষ ত্যাগ করেন। হামাদানে তাকে সমাহিত করা হয়।

লেখক: মরমী গবেষক, কলামিষ্ট ও প্রাবন্ধিক।

About Chattogram Post

Check Also

আগামী ২২ আগস্ট থেকে বন্ধ হচ্ছে ফেসবুক গ্রুপ চ্যাট

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেক্স ।। প্রকাশ : 17.08.19, সময় : 9.19 pm কাজের প্রয়োজনে কিংবা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সম্পাদক ও প্রকাশক : সৈয়দ তারেকুল আনোয়ার

বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয় : রুহি কম্পিউটার

আল-ফতেহ শপিং সেন্টার (৪র্থ তলা)

১৮২ আন্দরকিল্লা, চট্টগ্রাম।

মোবাইলঃ 01670438670, 01819976697

ই-মেইলঃ chattogrampost@gmail.com