সর্বশেষ খবর
Home / Uncategorized / নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে সচেতন হতে হবে

নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে সচেতন হতে হবে

লায়ন ডাঃ বরুণ কুমার আচার্য বলাই

প্রকাশ : 06.07.19, সময় : 5.36 pm

নৈতিকতা সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। সেই পরিবেশ হতে পারে ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাষ্ট্রীয় পরিবেশে। নৈতিকতা সম্পর্কে একজন মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিও থাকতে হবে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সে দৃষ্টিভঙ্গির উপর একসময় পরিবেশের প্রভাব পড়ে। এ জন্য প্রয়োজন নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা অর্জন করা। আমরা জানি, শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। যে জাতি যতবেশী শিক্ষিত সে জাতি ততবেশী উন্নত। আর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহন করাও জরুরী। কেননা এর মধ্যেই ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির পথনির্দেশনা রয়েছে। আর নৈতিকতা হলো ধর্মবোধের প্রকৃত ভিত্তি। এ জন্য নৈতিকতার গুরুত্ব ও প্রাধান্য সবচেয়ে বেশী। নৈতিকতা কোন ব্যক্তির মধ্যে এমন আচরণ, যা অপরের প্রতি ক্ষমা ও মার্জনা, উদারতা ও দানশীলতা, ধৈর্য, বিনয় ও নম্রতা ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত হওয়াকে বুঝায়। এক কথায় পূণ্যাবলী সঠিক বিকাশ ও উৎকর্ষতা সাধনই নৈতিকতা। আর এটিই সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার রক্ষাকবচ। যে সমাজের মানুষের মাঝে নৈতিকতাবোধ যতটা বেশী হবে সে সমাজের মানুষ ততটাই শান্তি ও নিরাপত্তা উপভোগ করবে। সমাজ জীবনে বসবাসরত প্রত্যেক মানুষের মাঝে দেখা দেয় প্রেম-প্রীতি, ভালবাসা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি আর স্নেহমমতা। এ সবের উন্মেষ ঘটে তখনই যখন মানুষের মাঝে নৈতিকতাবোধ থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হ’লেও সত্য যে, আজ আমাদের মাঝে নৈতিকতা লোপ পেয়েছে। বিলুপ্ত হয়েছে ন্যায়পরয়ণতার সিংহদ্বার। আর নৈতিকতা বর্জিত সমাজে দেখা দেয় ব্যক্তিগত, দলগত বা জাতীয় জীবনে সংঘাত, হিংসা-বিদ্বেষ, হানা-হানি, গীবত ও পরশ্রীকাতরতা। সৃষ্টি হয় একে অপরকে পর্যুদস্ত করার বাসনা। ফলে সৃষ্টি হয় নৈতিকতার অবক্ষয়। নৈতিক শিক্ষার প্রথম কেন্দ্র হচ্ছে পরিবার। পরিবারের সদস্যরা যদি নৈতিক হয়, শিশুরাও হয়ে উঠে নৈতিক। বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার যদি এখন থেকে নৈতিকতার বিকাশে সোচ্চার হয়, তাহলে নিদ্বির্ধায় আমরা পাব একটি আদর্শ সমাজ। যেখানে অন্যায় নামক শব্দটির পাত্তা থাকবে না। অন্যায় নামক শব্দটিই হবে একটি নিখোঁজ শব্দ। আমরা জানি, দেশের শিক্ষা, গবেষনা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, সরকারি, বেসরকারি ক্ষেত্রে ইন্টারনেট একটি প্রজ্জ্বলমান আলোর নাম। বতর্মানে পৃথিবীর ৪৪.২ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ইন্টারনেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিটিআরসির রিপোর্ট অনুযায়ী এ দেশে ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৪৭.৭৯০ মিলিয়ন অথার্ৎ প্রায় ৫ কোটি। এর ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হচ্ছে। সোস্যাল মিডিয়াগুলোও বেশ ক্রিয়াশীল। এ দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তিন কোটি ছাড়িয়ে গেছে। প্রতি ১২ সেকেন্ড অন্তর একটা করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হচ্ছে, যেটা বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের জন্মহারের থেকেও বেশি। ফেসবুকের একটি ডাকেই শত, সহস্র জনতা অভিন্ন দাবিতে একত্রিত হচ্ছে ও সহমত পোষন করছে। যার কল্যাণে যেকোন ঘটনাবলী অতিসহজে পৌঁছে যাচ্ছে যেটা প্রচলিত গণমাধ্যমের দ্বারাও অসম্ভব ব্যাপার। ফেসবুকের কল্যাণেই সিলেটের রাজন হত্যার দ্রুত বিচার, বদরুল কতৃর্ক খাদেজাকে জখম, তনু হত্যা এবং বনানীর রেইন্ট্রিতে তরুণী ধর্ষনের অপ্রতিরোধ্য প্রতিবাদ এ দেশের মানুষ দেখেছে। কিন্তু এর নেতিবাচক ব্যবহারও কম না বরং একটু বেশিই। ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে নানাবিধ চাকরির প্রশ্ন প্রতিনিয়ত ফাঁস হচ্ছে। ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছর আগে রামুতে জাতিগত দাঙ্গা এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনাও ঘটেছিল। লাইভে এসে অশালীন আচরণ এবং দেহের স্পশর্কাতর জায়গার প্রদশর্ন এসব নিন্দনীয় ঘটনাও ঘটছে। ফেইক অ্যাকাউন্ট, হ্যাকিং প্রভৃতির ফলে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। অল্প বয়সেই ফেসবুক, ম্যাসেনঞ্জার ও মোবাইল ব্যবহারের কারণে শিক্ষাথীর্রা খুব সহজেই বিপথে পা বাড়াচ্ছে। কেননা ফেসবুকের বিশাল দুনিয়ায়, বন্ধু বান্ধবের অভাব নেই, যাদের অধিকাংশই মুখোশধারী। তারা মিথ্যাচার করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শিক্ষাথীর্রা তাদের বেশিরভাগ সময়ই ফেসবুক ব্যবহারে ব্যয় করছে। ফলে দেখা দিচ্ছে ফল বিপযর্য়। প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মানসিক অবসাদ সৃষ্টি হচ্ছে এবং নতুন নতুন মানসিক রোগের উৎপত্তি ঘটছে। হতাশার পরিমাণ বাড়ছে এবং কখনো কখনো মানুষ বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার মতো আত্মবিধ্বংসী পথ। অতিমাত্রায় প্রযুক্তির প্রতি আসক্তির ফলে মানুষ হয়ে উঠছে যান্ত্রিক। ফলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা হ্রাস পাচ্ছে। মানুষ হয়ে উঠছে আত্মস্বাথের্লাভী এবং আত্মকেন্দ্রিক। এছাড়াও পনোর্গ্রাফি আর একটা আতঙ্কের নাম। পনোর্গ্রাফি ইন্টারনেটে অনেক সহজলভ্য হওয়ায় এতে আসক্তির ফলে তরুণরা অশ্লীলতা, অবাধ যৌনাচার, বহুকামিতা এবং সমকামিতার মতো বিকারগ্রস্ত মানসিকতার অধিকারী হচ্ছে। ফলে শিশু ধর্ষনের মতো নিকৃষ্ট ঘটনাও ঘটছে এদেশে। এ দেশের দৃষ্টিনন্দন পার্কগুলোতে চলছে অশ্লীলতার খেলা, চলছে দেহব্যবসা, হয়ে উঠেছে বেহায়াপনার উত্তম উঠান। যেখানে বিপথগামী তরুণ-তরুণীরা কুরুচিপূর্ণ যৌনাচারে লিপ্ত হচ্ছে। দুর্বল পারিবারিক কাঠামোর কারণে মাদকাসক্তদের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকের করালগ্রাসে আক্রান্ত হয়ে ঐশী কর্তৃক তার বাবা-মাকে হত্যার ঘটনা কারও অজানা নয়। মাদক কেনার টাকার জন্য মাদকসেবীরা পাগলের মতো আচরণ করে। বেছে নেয় খারাপ পথের ঠিকানা, পা বাড়ায় খারাপ জগতে। যুবকরা হচ্ছে আমাদের দেশের প্রাণশক্তি, সেই প্রাণশক্তিই ক্ষয়ে যাচ্ছে মাদক নামক বিষের থাবায়। যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য এর চেয়ে ভয়াবহ আর কি হতে পারে। মাদকতার এই রকম ভয়াবহ পরিণতি নৈতিকতাকে সত্যি আজ হুমকির সম্মুখিন করেছে। এছাড়াও আকাশ সংস্কৃতি, ভিন্নদেশী সংস্কৃতির ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা হারাচ্ছে নৈতিকতা। আমরা শিশুদের হাতে ছোট্ট বয়সেই ফোন তুলে দেই। যেটা একটা মারাত্মক ভুল। শিশুদের সব আবদার আপনার মেটাতে হবে না। বরং তাকে লড়াই করা শেখাতে হবে, তাকে জানাতে হবে পৃথিবী কতটা নিষ্ঠুর। চাওয়ার সঙ্গে পেলেই শিশুরা মনে করবে পৃথিবীতে হয়ত সবকিছু খুব সহজেই পাওয়া যায়। কিন্তু বাস্তব জীবনে এসে পরিণত বয়সে যখন সে কোনোকিছুই সহজে পায় না, তখন আশ্রয় নেয় অসৎ পথের। সন্তানদের সঠিক ধমীর্য় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। কারণ ধর্ম হচ্ছে নৈতিক শিক্ষার পীঠস্থান। যার ভেতরে ধমীর্য় জ্ঞান থাকে সে সহজে কোন খারাপ কাজ করতে পারে না। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে। মূলত নয় থেকে আঠারো বছর পযর্ন্ত সময়টা হচ্ছে সন্তানদের একটা পরিবতের্নর সময়। এ সময় অনেক অভিভাবকই তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। এ সময় পিতামাতার তাদের সন্তানদের পাশে থাকা একান্ত কতর্ব্য। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নৈতিকতা সম্পর্কে উপযুক্ত পাঠ অন্তভুর্ক্ত করতে হবে এবং শিক্ষকদের শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। সবোর্পরি শিক্ষাথীদের যথার্থ মানুষ হওয়ার শিক্ষা প্রদান করতে হবে। নৈতিকতার অবক্ষয়ের ফলে প্রতিদিন অকাতরে প্রাণ ঝরছে নানান কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, যৌথ পরিবার বিলুপ্তি, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনে ফাটল, এঘেয়ে জীবন-যাপন, একাকীত্ব, হতাশা, দুশ্চিন্তা, সামাজিক ও পারিবারিকভাবে নিগৃহীত হওয়া, অসৎ সঙ্গে মেলামেশা থেকে ধীরে ধীরে তরুণরা বিপদগামী হয়। একসময় বিপদের চরমতম সীমায় পৌঁছেন তারা। যা কারো কাম্য হতে পারে না। কেননা প্রতিটা তরুণ জাতির ভবিষ্যত। আর এ নৈতিকতার অবক্ষয় রোধ করতে হলে অভিভাবকের দায়িত্ব ও সচেতনতা বৃদ্ধি সহ ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার চর্চা করতে হবে ও মানতে হবে। ইন্টারনেট ও মোবাইলের মন্দ ব্যবহারের সুযোগগুলো বন্ধ করাসহ এমন শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যা দ্বারা নৈতিকতা অবক্ষয়রোধ সম্ভব। আসুন নৈতিকতার অবক্ষয় রোধে সকলেই মিলে নিজেদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সার্থে একটি সুন্দর-সুখী শান্তিপূর্ণ ও সম্মৃদ্ধশালী সমাজ ও দেশ গঠনে সম্মিলিতভাবে আত্ম নিয়োগ করি।

লেখক: মরমী গবেষক, প্রাবন্ধিক ও বহু গ্রন্থপ্রণেতা।

About Chattogram Post

Check Also

আগামী ২২ আগস্ট থেকে বন্ধ হচ্ছে ফেসবুক গ্রুপ চ্যাট

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেক্স ।। প্রকাশ : 17.08.19, সময় : 9.19 pm কাজের প্রয়োজনে কিংবা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সম্পাদক ও প্রকাশক : সৈয়দ তারেকুল আনোয়ার

বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয় : রুহি কম্পিউটার

আল-ফতেহ শপিং সেন্টার (৪র্থ তলা)

১৮২ আন্দরকিল্লা, চট্টগ্রাম।

মোবাইলঃ 01670438670, 01819976697

ই-মেইলঃ chattogrampost@gmail.com