সর্বশেষ খবর
Home / slider / শিশুরা উজ্জীবিত হোক বঙ্গবন্ধুর আদর্শে

শিশুরা উজ্জীবিত হোক বঙ্গবন্ধুর আদর্শে

লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য

প্রকাশ : 16.03.2020, সময় : 6.11 pm

নতুন দিগন্তের বার্তা নিয়ে এসেছে ২০২০ সাল। শুরু হওয়া বছরটিকে এবার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বছর হিসেবেই মনে করছেন সকলে। কেননা এ বর্ষেই শুরু হতে যাচ্ছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। এই ২০২০ সালের ১৭ মার্চ হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। ফলে ১৭ মার্চ ২০২০ সাল থেকে ২৬ মার্চ ২০২১ সাল পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে মুজিববর্ষ। নানা উন্নয়ন ও গঠনমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হবে। শুধু বাংলাদেশে নয়, ইউনেস্কোর সদস্যভুক্ত ১৯৫টি দেশে একযোগে পালিত হবে মুজিববর্ষ। আজ শততম জন্মদিনে গোটা জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে, জাতিসত্তা পরিচয়ের চূড়ান্ত রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আজ তাঁর এই শততম জন্মদিন যথাযোগ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে উদযাপিত হচ্ছে সারাদেশেসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তাই বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি আনন্দের দিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু একজনই জন্মেছিলেন। যাঁর জন্ম না হলে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হতো না। এজন্য ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে পালন করা হয়। আজ সরকারি ছুটির দিনও। এছাড়াও ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবেও উদযাপন করা হচ্ছে এ দিনটি। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তদানীন্তন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান ও মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। লুৎফর-সায়েরা দম্পতির এ সন্তানই পরে এ দেশের মানুষের পরাধীনতা মুক্তির ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন। টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্কুল জীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। কৈশোরে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে প্রথমবারের মতো কারাবরণ করেন। ম্যাট্রিক পাসের পর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের মতো রাজনীতিকের সান্নিধ্যে আসেন। এ নেতাদের সাহচর্যে তিনি নিজেকে ছাত্র-যুব নেতা হিসেবে রাজনীতির অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ছোট-বড় সবার প্রিয়। কারণ তিনি সবাইকে ভালোবাসতেন। খুব সহজে সবাইকে আপন করে নিতেন। মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল গভীর মমতা। বিশেষ করে ছোটদের তিনি খুব ভালোবাসতেন। স্নেহ করতেন। শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন। শিশুদের সবকিছুকে সহজে বুঝতে পারতেন তিনি। আর এ জন্যই তাঁর জন্মদিন ১৭ মার্চ পালন করা হয় জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন ভারি দয়ালু। তিনি দেখলেন, কোনো ছেলে ভীষণ গরিব, টাকার অভাবে ছাতা কিনতে পারে না, রোদ-বৃষ্টিতে কষ্ট পাচ্ছে, অমনি তাঁর ছাতাটা দিয়ে দিতেন। কিংবা টাকার অভাবে কোনো ছেলে বইপত্র কিনতে পারছে না, দিয়ে দিলেন নিজের বইপত্র। এমনকি একদিন নাকি এক ছেলেকে ছেঁড়া কাপড় পরে থাকতে দেখে নিজের পরনের কাপড় খুলে দিয়েছিলেন তিনি। দেশে ও জনগণের বিভিন্ন কাজে বঙ্গবন্ধু যখন গ্রামেগঞ্জে যেতেন, তখন চলার পথে শিশুদের দেখলে গাড়ি থামিয়ে তাদের সঙ্গে গল্প করতেন। খোঁজখবর নিতেন। দুস্থ ও গরিব শিশুদের দেখলে কাছে টানতেন। কখনো কখনো নিজের গাড়িতে উঠিয়ে অফিসে বা নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতেন। এরপর কাপড়-চোপড়সহ নানান উপহার দিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটাতেন। শৈশব থেকেই তাঁর বড় হৃদয় এবং ছোট-বড় সবার জন্য দরদি মনের পরিচয় পাওয়া যায়। মানুষের প্রতি দরদি হওয়ার কারণেই নিপীড়িত বাঙালিকে তিনি অধিকার আদায়ে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছেন। পেরেছেন সচেতন করতে, সংগ্রামী করতে। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আইয়ুব খান জোর করেই দেশের ক্ষমতা দখল করে নেন। শেখ মুজিবসহ বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে জেলে আটকে রাখেন। পাঁচ বছরের জন্য পুরো দেশে রাজনীতি বন্ধ করে দিলে গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বমুহূর্তে শেখ মুজিবুর রহমান তরুণদের এক যুগান্তকারী নির্দেশ দিয়ে গেলেন। বললেন, ‘এই পাঁচ বছর তোমরা শিশু সংগঠন কচি-কাঁচার মেলার মাধ্যমে কাজ করো। নিজেদের সচল রাখো।’ আমরা জানি দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিশু সংগঠনটি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের মাত্র দুই বছর আগে অর্থাৎ ১৯৫৬ সালের ৫ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয়। এ জন্যই তিনি এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ বঙ্গবন্ধু জানতেন, কচি-কাঁচার মেলা প্রগতিশীল একটি শিশু সংগঠন। শিক্ষা, সংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলার মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, দেশ ও মানুষকে ভালোবাসার মানসিকতা বিকাশে শিশুরা সেখানে নিজেদের সুনাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠার প্রেরণা পাচ্ছে। শিশুরা দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে। ১৯৬৩ সাল। শেখ মুজিবুর রহমান তখনো বঙ্গবন্ধু উপাধি পাননি, জাতির পিতাও হননি। তবে আওয়ামী লীগের বড় নেতা। সেই সময়ই তিনি শিশুদের টানে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে কচি-কাঁচার মেলা আয়োজিত শিশু আনন্দমেলায় এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ‘এই পবিত্র শিশুদের সঙ্গে মিশি মনটাকে একটু হালকা করার জন্য।’ ছোট্ট এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শিশুদের প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। ১৯৭২ সালে একদিন কচি-কাঁচার মেলার কিছু ক্ষুদে বন্ধু তাদের আঁকা মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবন গণভবনে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিজের চোখে দেখে শিশুরা প্রায় তিনশ ছবি আঁকে। এর মধ্যে বাছাই করা ৭০টি ছবি রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই দেখান বঙ্গবন্ধুকে। ছবিগুলো বঙ্গবন্ধু রাশিয়া সফরের সময় সে দেশের শিশুদের জন্য নিয়ে যাবেন শুভেচ্ছা-উপহার হিসেবে। বঙ্গবন্ধু খুব খুশি হলেন ক্ষুদে শিল্পীবন্ধুদের কাছে পেয়ে। তিনি তাদের হাসিমুখে আদর করলেন। তিনি আগ্রহভরে বাচ্চাদের আঁকা ছবিগুলো দেখছিলেন আর মন খুলে ছবি ও ছবির আঁকিয়েদের প্রশংসা করছিলেন। তিনি মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘আমার দেশের শিশুরা এমন নিখুঁত ছবি আঁকতে পারে, এসব না দেখলে তা বিশ্বাস করা যায় না।’ তিনি শিশুদের সঙ্গে সে দিন প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা কাটান এবং যত্নের সঙ্গে খাবার পরিবেশন করেন। সে দিন বঙ্গবন্ধুর ঘর থেকে শিশুরা বেরিয়ে আসার সময় তিনি গভীর তৃপ্তিভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আজকের কর্মব্যস্ত সারাটা দিনের মধ্যে এই একটুখানি সময়ের জন্য আমি শান্তি পেলাম। শিশুদের সান্নিধ্য আমাকে সব অবসাদ থেকে মুক্তি দিয়েছে।’ শুধু তাই নয়। বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সময়ে কচি-কাঁচার মেলা, খেলাঘরসহ অন্যান্য সংগঠনের শিশুবন্ধুদের অনুষ্ঠান ও সমাবেশে গিয়েছেন। তাদের মার্চপাস্ট, লাঠিখেলা, নাটক প্রভৃতি পরিবেশনা উপভোগ করেছেন। শিশুদের এমন উপস্থাপনা দেখে অভিভূত হয়েছেন। প্রশংসা করেছেন। তিনি এত সহজে, এত আন্তরিকভাবে শিশুদের সঙ্গে মিশে যেতেন যে, শিশুরাও তাঁকে খুব কম সময়ের মধ্যেই আপন করে নিত। ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরেই বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন। শিশুদের প্রিয় মানুষ বঙ্গবন্ধু শিশুদের কল্যাণে ১৯৭৪ সালের ২২ জুন জাতীয় শিশু আইন (চিলড্রেন অ্যাক্ট) জারি করেন। এই আইনের মাধ্যমে শিশুদের নাম ও জাতীয়তার অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। শিশুদের প্রতি সব ধরনের অবহেলা, শোষণ, নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন, খারাপ কাজে লাগানো ইত্যাদি থেকে নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়াও আগামীর দেশ গড়ার কারিগর শিশুদের কল্যাণে নিয়েছেন অনেক প্রকল্প। কিন্তু সেই সুযোগ বেশিদিন পাননি। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকদের তপ্ত বুলেটে সপরিবারে নিহত হন বাঙালির এই অবিসংবাদিত নেতা। শুরু হয় দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত দিকে নিয়ে যাওয়ার পালা। ১৯৭৫-পরবর্তী ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার অনেক চক্রান্ত ষড়যন্ত্র অপচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সবই ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ফের ক্ষমতাসীন হয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের সরকার। শেখ হাসিনা প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ দিবসটি পালন শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতে দেশ গড়ার নেতৃত্ব দিতে হবে আজকের শিশুদেরই। তাই শিশুরা যেন সৃজনশীল মুক্তমনের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে তিনি সব সময়ই সেটা চাইতেন। তাই জাতির পিতার জন্মদিনকে শিশু দিবস হিসেবে পালন খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই মহান নেতার জীবন ও আদর্শ অনুসরণে এ দেশের শিশুদের যথাযোগ্য সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই হোক আজকে আমাদের অঙ্গীকার। আজকের এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাঁর প্রতি বিনম্রচিত্তে গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করছি ও তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে শিশুরা উজ্জীবিত হোক বঙ্গবন্ধুর আদর্শে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও মরমী গবেষক।

About Chattogram Post

Check Also

স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী মৃনাল ভট্টাচার্যের মৃত্যুতে গীতিকবি সংসদের শোক

প্রেস বিজ্ঞপ্তি ।। প্রকাশ : 12.07.2020, সময় : 4.26 pm স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : নিজাম উদ্দিন মাহমুদ হোসাইন

সম্পাদক ও প্রকাশক : সৈয়দ তারেকুল আনোয়ার

বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয় : রুহি কম্পিউটার

আল-ফতেহ শপিং সেন্টার (৪র্থ তলা)

১৮২ আন্দরকিল্লা, চট্টগ্রাম।

মোবাইলঃ 01670438670, 01819976697

ই-মেইলঃ chattogrampost@gmail.com