
নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
কড়াইল বস্তির বৌবাজার কুমিল্লা অংশের বাসিন্দা খোকন মিয়া। এক দিন আগেও তাঁর তিনটি দোকান ও ছয়টি বসতঘর ছিল। ছিল টাকা–পয়সা, সোনাদানা, ঘরের নামীদামী আসবাবপত্র। কিন্তু এখন কিছুই নেই। বুধবার দুপুরে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে পোড়া জিনিসপত্র সরাচ্ছিলেন তিনি। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মা মিনুয়ারা বেগম ও ভাবি।
খোকনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি জানালেন, তাঁর ঘরের পাশেই ছিল তিনটি দোকান। সেই দোকানের আয়েই চলত সংসার। কিন্তু আগুনে দোকান–ঘর কিছুই রক্ষা করতে পারেননি। পরিবারের সদস্যদের ঘর থেকে বের করে দিয়ে এসে দেখেন, দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খোকনের মা বলছিলেন, কিচ্ছু নিতে পারিনি বাবা। তাঁর পায়ের পাশে পড়ে থাকা একটি সেলাই মেশিন দেখিয়ে বললেন, এইটা যে নেব, সেই সময়ও পাই নাই। নিলে অবশ্য পুইড়তো না।
মিনুয়ারা জানান, গত দুই যুগে তাঁদের ঘর তিনবার পুড়েছে। আগের দুই বার আবার উঠতে পেরেছিলেন। কিন্তু এবার সব শেষ। তিনি বলেন, ২০২৪, ২০২৭ আর ২০২৫—এই তিনবার ঘর পুইড়ছে। এবার আর কিছুই রইল না। পুরোপুরি নিঃস্ব।
মিনুয়ারা বেগম জানান, দুই ছেলে ও অন্যদের নিয়ে ছয়টি পরিবার একসঙ্গে থাকতেন তাঁরা। সবার ঘরই পুড়ে গেছে।
আগুন লাগার মুহূর্ত স্মরণ করে তিনি বলেন, বাবা, হারাম কিছুই নিতে পারিনি। একটার বয়স ছয় মাস, আরেকটার এক মাস—এই দুইটা নাতির বউরে নিয়া দৌড় দিছি। কেমন করে বের হইছি, কইতে পারি না বাবা। চাইরটা বাচ্চা, তিনটা মাইয়া নিয়া দৌড় দিছি। সামনে ঘরে আগুন—কি করুম, কিছুই বুঝছিলাম না।
তাঁদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর থানায়। কিন্তু প্রায় ২৬ বছর ধরে তারা এই বস্তিতেই থাকছেন। মিনুয়ারা বলেন, আমরা ১৯৯৮ সালে এই বস্তিতে ঢুকছি। তখন আমার ছোট পোলার বয়স আছিল পাঁচ মাস।
গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে কুমিল্লা বস্তির পূর্ব অংশে থাকেন জোবেদা বেগম। স্বামীহারা এই নারী তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতেন। তবে কয়েক মাস ধরে অসুস্থতার কারণে আর কাজ করতে পারেন না। এখন ছেলেদের আয়ে চলে সংসার। ঘরের সবকিছুই পুড়ে গেছে। পোড়া ফ্যানের দুটি কয়েল হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন তাঁর জামাই লিমন ও স্থানীয় এক প্রতিবেশী।
ফাঁকে জোবেদার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, তাঁর দুই ছেলে কাজ করেন, একজন ছেলে পড়াশোনা করে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আগুনের খবর পেয়ে জামাই লিমন একমাত্র মেয়ে আদিবাকে নিয়ে ছুটে এসেছেন।
জোবেদা সম্প্রতি গ্রামের বাড়ি শেরপুরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। গতকালই ফিরেছেন। কিন্তু এক রাতও কাটাতে পারলেন না ঘরে। এর আগেই তাঁর থাকার ঘরটি পুড়ে ছাই।
তিনি বলেন, মানুষের বাসায় কাজ করে তিন ছেলে–এক মেয়েরে মানুষ করেছি। এখন লিভারের সমস্যা। দুই ছেলে কাজ করে—ওরাই খাওয়ায়। এখন দুপুরে কী খাব, সেই টাকাও নাই।
গত সাত বছর ধরে এই বস্তিতে থাকেন শেরপুর সদরের ললিতাবাড়ীর নুরজাহান বেগম। স্বামী–স্ত্রী মিলে থাকতেন। তাঁদের ঘরটিও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, কোনো চিহ্নমাত্র নেই।
তিনি বলেন, বাইরে ছিলাম কাজে। এসে দেখি—সব শেষ।
শেরপুরের গার্মেন্টসকর্মী শাহ আলী পাঁচ বছর ধরে থাকেন এই বস্তিতে। আগুন লাগার সময় তিনি কারখানায় ছিলেন। খবর পেয়ে এসে দেখেন, কিছুই নেই।
তিনি বলেন, আমরা ৩০টা পরিবার থাকতাম এখানে। এখন কারও ঘরই নাই। সবাই পুরো রাত খোলা আকাশের নিচে কাটাইছি।
তিনি আরও বলেন, ফ্রিজ, টিভি, খাট, আসবাব—সব পুইড়া গেছে। শুধু ছেলেরে ঘর থেইকা বের করতে পারছি। আগুন লাগার সময় কিছুই নিতে পারি নাই।