
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও বন্যার পানিতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সবকটি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেক পরিবারের ঘরে পানি প্রবেশ করায় চুলায় আগুন জ্বলছে না, রান্না করতে না পেরে চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে বানভাসি মানুষের।
এমন পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সমাজসেবক ও স্বেচ্ছাসেবীরা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ইউনিয়নে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে এসব খাবার পানিবন্দি মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়া হয়।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৯ হাজার ৫ শত প্যাকেট শুকনো খাবার, ৭ হাজার প্যাকেট রান্না খাবার ও ১২৬ মে.টন চাল, ১ লক্ষ ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১০০টি হাইজিন বক্স, পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার স্যালাইন ও ১৫৬ টি জেরিকেন পানি বিতরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ও মজুদ রাখা হয়েছে ২ শত প্যাকেট শুকনা খাবার ও সদ্য বরাদ্দ প্রাপ্ত ৫০.০০ মে.টন চাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি মোঃ ওমর সানি আকন নেতৃত্বে নৌকাযোগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শুকনা খাবার ও নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বানভাসি মানুষের কী দুর্ভোগ তা সরাসরি না আসলে কেউ বুঝবে না। তিনি দলমত নির্বিশেষে সবাইকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
বৈলছড়ী ইউনিয়নে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দি হাজারো পরিবারের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করেছেন বৈলছড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক সিআইপি ইব্রাহিম।
প্রথম ধাপে ইউনিয়নের বেশির ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত বৈলছড়ী ২,৩, ৫, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ১১ পরিবারের মাঝে চাল ও শুকনা খাবার তুলে দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে ইউনিয়নের অন্যান্য ওয়ার্ডের বন্যাকবলিত মানুষের মাঝেও সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন দাতা সংস্থা ত্রাণ বিতরণ করছেন বলে জানান বৈলছড়ী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান বিকাশ দত্ত।
বাঁশখালী উপজেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক ও বাহারছড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাষ্টার লোকমান বলেন, সাম্প্রতিক টানা বর্ষণে বাহারছড়া ইউনিয়নের প্রায় ৭-৮ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেকের ঘরে পানি প্রবেশ করায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন। একই সময়ে বাহারছড়া ইউনিয়নে পানিতে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ও পানিবন্দি পরিবারের মাঝে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন দাতা সংস্থা শুকনা খাবার বিতরণ করছেন।
কাথরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব বিশিষ্ট সমাজসেবক মোঃ হারুনুর রশিদ কাথরিয়া ইউনিয়ন নিজ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজ হাতে শুকনা খাবার ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেন এবং দুর্গত মানুষের খোঁজখবর নেন।
চাম্বল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদ উল্লাহ নেতৃত্বে ব্যক্তিগত অর্থায়নে ৩ শতাধিক পরিবারের মাঝে শুকনা খাবার ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ৬-৭ হাজার ঘর-বাড়ি।
সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পশ্চিম চাম্বল ১, ২, ৩ ও ৪ নং ওয়ার্ডে। এখন ও অনেক মানুষ পানিবন্দি। স্থানীয়রা তার এই মানবিক উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
একই সাথে এমন পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসন পাশাপাশি বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রেস ক্লাব পক্ষ থেকে শুকনো ও রান্না করা বিতরণ করা হয়েছে।
বাঁশখালী প্রেস ক্লাবের সদস্য সচিব মুহাম্মদ মিজান বিন তাহের জানান, বাঁশখালীর বানভাসি মানুষ খুবই কষ্টে আছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি মাত্র। এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, সামাজিক ও মানবিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
চাম্বল ইউনিয়ন সমাজসেবক ও জামায়াত নেতা আলী নেওয়াজ চৌধুরী ইরান বলেন, চাম্বল ইউনিয়নের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। বিশেষ করে আমার ওয়ার্ড ১,২,৩ ও ৮ নং ওয়ার্ডের প্রায় ৬ শতাধিক পরিবারের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। যার যার অবস্থান থেকে জনপ্রতিনিধি ও বিত্তবানরা এগিয়ে এলে দুর্গত মানুষের অনেক উপকার হবে।
খানখানাবাদ ইউনিয়নে বিশিষ্ট সমাজসেবক ও ব্যবসায়ী আলহাজ্ব মুহাম্মদ নিজামুল হক চৌধুরী সোহেল এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে পুরো ইউনিয়ন জুড়ে নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। তার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন দুর্গত এলাকার বাসিন্দারা।
আলহাজ্ব মুহাম্মদ নিজামুল হক চৌধুরী সোহেল বলেন, আমার এলাকার বানভাসি মানুষ খুবই কষ্টে আছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি মাত্র।
বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র আলহাজ্ব কামরুল ইসলাম হোসাইনীর পক্ষ থেকে পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে পানিবন্দি হাজারো ও মানুষের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
বাঁশখালী পৌরসভার আস্করিয়া পাড়া, খলিলশাহ পাড়া সহ আশ পাশের এলাকায় কামরুল ইসলাম হোসাইনীর পক্ষ থেকে শুকনা খাবার বিতরণ করেছেন সাবেক ছাত্রনেতা এটিএম কপিল উদ্দিন, জিয়াউল হক জিয়া ও ওসমান গণী মুজাহিদ ।
শেখেরখীল ইউনিয়নের বিশিষ্ট সমাজসেবক ও রাজনিতীবিদ সাঈদ হোসেন চৌধুরী আরফাতের নিজস্ব অর্থায়নে বিভিন্ন ওয়ার্ডে রান্না করা খাবার ও শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
শেখেরখীল ইউনিয়ন লালজীবন সহ বিভিন্ন এলাকায় ৫০০ পরিবারের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছেন মানবিক ডাক্তার দিদারুল হক সাকিব ।
এ দিকে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রুহুল আমীন জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৯ হাজার ৫ শত প্যাকেট শুকনো খাবার, ৭ হাজার প্যাকেট রান্না খাবার ও ১২৬ মে.টন চাল, ১ লক্ষ ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১০০টি হাইজিন বক্স, পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার স্যালাইন ও ১৫৬ টি জেরিকেন পানি বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ও মজুদ রাখা হয়েছে ২ শত প্যাকেট শুকনা খাবার ও সদ্য বরাদ্দ প্রাপ্ত ৫০.০০ মে.টন চাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এছাড়াও বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামি আন্দোলন, নেজাম ইসলাম পাটি, এনসিপি, খেলাফত মজলিস সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ ও শুকনা খাবার বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক সংগঠন, সমাজসেবক ও স্বেচ্ছাসেবীদের এমন মানবিক উদ্যোগে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বানভাসি মানুষের মাঝে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ ও খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।