
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমা। তিনি বলেছেন, ক্ষেত-খামার, হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল, রাস্তাঘাট ও নদীঘাট—সর্বত্র নারীর পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া মাঠে আয়োজিত নারী সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি। ‘পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলুন’—এই আহ্বান এবং নারীর সর্বত্র নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে হিল উইমেন্স ফেডারেশন এ সমাবেশ ও র্যালির আয়োজন করে।
সমাবেশের উদ্বোধন করেন গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে খাগড়াছড়ি সদরের স্বনির্ভর এলাকায় গুলিতে নিহত জুনান চাকমার মা রূপসা চাকমা। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি তাঁর ছেলে জুনান চাকমার হত্যার বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে, কিন্তু এখনো বিচার হয়নি। এ বছর জুনান হত্যা দিবসে পারিবারিকভাবে ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের কথা জানিয়ে সর্বস্তরের মানুষকে সেখানে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
উদ্বোধনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রথম শহীদ ভরদ্বাজ মুনি চাকমাসহ সকল শহীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সমাবেশে নীতি চাকমা সংগঠনের বিশেষ সম্মেলনে গৃহীত সাত দফা রাজনৈতিক প্রস্তাবনা উপস্থিত জনতার সামনে পড়ে শোনান। আয়োজকদের দাবি, এতে উপস্থিত ১ হাজার ৫০০-এর বেশি নারী, শিক্ষার্থী ও জনতা হাত উঁচিয়ে সমর্থন জানান।
নীতি চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা রাজনৈতিক এবং এর সমাধানও রাজনৈতিকভাবে করতে হবে। ‘সন্ত্রাস দমন, বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন ও সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এ ধরনের পরিভাষা ব্যবহার করে মূল সমস্যা আড়াল করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে নীতি চাকমা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জাতিসত্তাসমূহের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের বাস্তব পরিবেশ তৈরি হবে।
সমাবেশে লেমপোস্টের গণমুক্তির গানের দলের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ফারহানা হক সামা বলেন, স্বাধীন দেশে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাধ্যমে জনগণের আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়। তিনি জুনান, বিপুল ও কল্পনা চাকমার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার দাবি জানান।
ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের বর্তমান কর্মকৌশলের সমালোচনা করেন। তিনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গগণ বিকাশ চাকমা বলেন, পাহাড়ের সংঘাতময় পরিস্থিতি একদিন নিরসন হবে। নিজেদের টিকে থাকার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) সভাপতি সমর চাকমা বলেন, দমন-পীড়ন ও হত্যা চালিয়ে জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। পাহাড়ি জনগণ ন্যায্য অধিকারের জন্য আন্দোলন করছে এবং ভয় দেখিয়ে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
সমাবেশে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নীতি চাকমার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন ফারহানা হক সামা, কণিকা দেওয়ান, নাওশিন ফ্লোরা, উষাতন চাকমা, গগণ বিকাশ চাকমা ও সমর চাকমা।
এ সময় গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য অনুপম চাকমা, জনপ্রতিনিধি প্রতিভা চাকমা, শান্ত চাকমাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশ শেষে প্রতিবাদী গান ও নৃত্য পরিবেশন করা হয়। পরে বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগানে একটি র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি বাবুছড়া প্রধান সড়কের নুয়োপাড়া এলাকায় গিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।