
নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
গত শুক্রবার ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসব ঘিরে তরুণী ও নারীদের সাজসজ্জায় প্রসাধনীর ব্যবহার থাকে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে উৎসবের শেষ দিনগুলোতে অনেকেই দেবী দুর্গার আদলে সাজতে পছন্দ করেন।
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের প্রসাধনীর বাজারেও বেড়েছে ক্রেতাদের আনাগোনা। পূজার সাজে নতুন পোশাকের পাশাপাশি লিপস্টিক, ফাউন্ডেশন, কাজল, আইলাইনার, মেকআপ কিট ও ত্বকের যত্নের বিভিন্ন পণ্য কিনছেন তরুণী ও নারীরা। উৎসবের আমেজে প্রসাধনীর চাহিদা বাড়ায় জমে উঠেছে বাজারের বেচাকেনাও।
চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার, টেরিবাজার ও জহুর হকার্স মার্কেটের বিভিন্ন দোকানে এসব পণ্যের বেচাকেনা ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি ব্যস্ততা। তবে ব্র্যান্ডভেদে দামের পার্থক্য, পণ্যের গুণগত মান, আমদানিকারকের পরিচয় ও মেয়াদ যাচাই না করে কেনাকাটা করলে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে নকল প্রসাধনীর কারণে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নগরের টেরিবাজারে প্রসাধনী কিনতে আসা তরুণী প্রায়ন্তী দত্ত বলেন, প্রসাধনী কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের বড় একটি অংশের কাছে দাম ও প্যাকেটের বাহ্যিক সৌন্দর্য গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের পণ্যের দাম এক দোকানে এক রকম, অন্য দোকানে আরেক রকম। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই কম দামের পণ্য বেছে নেন। কিন্তু পণ্যটি আসল কি না, অনুমোদিত উৎস থেকে আমদানি করা হয়েছে কি না কিংবা প্যাকেটে উল্লেখ করা তথ্যের সঙ্গে ভেতরের পণ্যের মিল আছে কি না, তা যাচাই করা সব সময় সহজ নয়। বিশেষ করে পরিচিত ব্র্যান্ডের নাম ও নকশা ব্যবহার করা নকল পণ্য থাকলে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে আসল-নকলের পার্থক্য নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৬ সালে চট্টগ্রামে নকল ও অনিয়মের অভিযোগে প্রসাধনীসংশ্লিষ্ট চারটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম ফরেন পোস্ট অফিসে অবৈধভাবে আমদানি করা পাকিস্তানি ‘গৌড়ি’ ব্র্যান্ডের ফর্সা করার ক্রিম জব্দ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
এরপর ৫ মার্চ নগরের আগ্রাবাদের আখতারুজ্জামান সেন্টারে অভিযান চালিয়ে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। মোড়কজাতকরণ নিবন্ধন সনদ ও আমদানি ছাড়পত্র না থাকায় ‘নেভার সীন’, ‘গ্রেস ভিউ’ ও ‘সিলিকা’ নামের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
১১ মার্চ চকবাজারে অভিযান চালিয়ে ‘দ্য সার্কেল’ ও ‘জান্নাত স্টেশন ১০৫’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে বিএসটিআইয়ের ভ্রাম্যমাণ আদালত। কসমেটিকস পণ্যের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দেখাতে না পারায় প্রতিষ্ঠান দুটিকে জরিমানা করা হয়।
সর্বশেষ, গত ১০ জুন কাজীর দেউড়িতে অভিযান চালিয়ে প্রসাধনী পণ্যের বিএসটিআই ছাড়পত্র দেখাতে না পারায় ‘দ্য বেবি শপ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই অভিযানে মিষ্টিজাতীয় পণ্যে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ না থাকায় ‘সিজল’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
রিয়াজউদ্দিন বাজারের পাইকারি প্রসাধনীর দোকান আল আইমান ট্রেডার্সের পরিচালক ওয়াহিদুল আলম বলেন, লিপস্টিক, ফাউন্ডেশন ও আইলাইনারের মতো পণ্যে রং, ঘনত্ব, গন্ধ ও ব্যবহারের অনুভূতিতে পার্থক্য থাকতে পারে। তবে শুধু এসব বৈশিষ্ট্য দেখে কোনো প্রসাধনী আসল না নকল, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। একইভাবে প্যাকেট দেখতে সুন্দর হলেই পণ্যটি নিরাপদ, এমন ধারণাও সঠিক নয়। পণ্যের গায়ে প্রস্তুতকারক বা আমদানিকারকের নাম-ঠিকানা, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তথ্য, ব্যাচ নম্বর এবং প্রয়োজনীয় লেবেল রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। শুধু কম দাম দেখে পণ্য কেনা উচিত নয়। প্রয়োজনে পণ্যের কিউআর কোডসহ অন্যান্য তথ্য যাচাই করে কেনাকাটা করা উচিত।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রসাধনীর দাম নির্ভর করে ব্র্যান্ড, পণ্যের পরিমাণ, আমদানি ব্যয়, পরিবেশক, বিক্রয়কেন্দ্র ও বিপণনব্যবস্থার ওপর। একই ব্র্যান্ডের পণ্যের বিভিন্ন সংস্করণ বা আকারের দামও আলাদা হতে পারে। তাই দুটি পণ্যের দাম তুলনা করার সময় ব্র্যান্ডের নামের পাশাপাশি পরিমাণ, সংস্করণ, উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।
এদিকে, পূজার সময় অনেক তরুণী বিউটি পারলারেও সাজসজ্জা করান। অভিযোগ রয়েছে, কিছু পার্লারে কম দামের নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ বা ভেজাল উপাদানযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করা হয়। এসব পণ্য ব্যবহারে ত্বকে জ্বালাপোড়া, অ্যালার্জি কিংবা চোখের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারে নকল প্রসাধনী বিক্রি ও উৎপাদনের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে এসব পণ্য জব্দের ঘটনাও ঘটেছে।
ভোক্তা অধিকার-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো দোকানে নকল বা মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী বিক্রির অভিযোগ উঠলে শুধু প্যাকেটের ছবি কিংবা দামের পার্থক্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট পণ্যের চালান, আমদানির কাগজপত্র, সরবরাহকারীর তথ্য এবং প্রয়োজনে পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। টেরিবাজার ও জহুর হকার্স মার্কেটে এমন পণ্য বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।
এদিকে, পূজার নকল প্রসাধনীর ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি করা দুটি চালান পরীক্ষা করে নিষিদ্ধ কয়েক ধরনের ক্রিম জব্দ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায় এনবিআর।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জব্দ করা প্রসাধনীগুলোর মধ্যে কয়েক ধরনের ক্রিম বিএসটিআই নিষিদ্ধ করেছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ঢাকার নিউমার্কেটের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফরচুন গ্লোবাল ট্রেডিং চীন থেকে ১১ হাজার ৯৫৬ কেজি পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু চালানটি পরীক্ষা করে মেশিনের পরিবর্তে ফেস ক্রিম, সান ক্রিমসহ বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, পুরান ঢাকার চকবাজারের কাফ কর্পোরেশন চীন থেকে সাড়ে ২২ টন টুথপিক আমদানির ঘোষণা দিয়েছিল। চালানটি পরীক্ষা করে মাত্র ১ হাজার ৬২০ কেজি টুথপিক পাওয়া যায়। বাকি পণ্যের মধ্যে ছিল পাকিস্তানে তৈরি ‘গৌড়ি’ বিউটি ক্রিম, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম ও অ্যান্টি-এজিং জেলসহ বিভিন্ন প্রসাধনী।
বিএসটিআই চট্টগ্রামের উপপরিচালক ইব্রাহিম খলিল বলেন, বিভিন্ন সময়ে নকল পণ্যের অভিযোগ পেয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব পণ্যের অনুমোদন রয়েছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হয়। পরে মান পরীক্ষা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ঢাকা পোস্টকে বলেন, পূজার মৌসুমে প্রসাধনীর বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে বাজার তদারকিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দোকানে নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ, লেবেলবিহীন বা অননুমোদিত পণ্য বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বা জেলা কার্যালয়ে অভিযোগ জানানো যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন, জব্দ করা পণ্যের তথ্য, পরীক্ষার ফল ও নেওয়া আইনগত ব্যবস্থার নথি থেকে বাজারের প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব। তবে কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন। এক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, নকল পণ্য বাজারজাতকারী অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান ও তদারকি চলমান রয়েছে। পূজাকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে উৎসবের সময় বলে নয়, ভেজাল ও নকল পণ্য বাজারজাতকরণ ঠেকাতে তারা নিয়মিত তৎপর রয়েছেন।