
নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
সামাজিক সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক বার্তা–এই দ্বিমুখী লক্ষ্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের চট্টগ্রাম সফর। আগামীকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম আসবেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম কোনো সরকার প্রধান হিসেবে এদিন সন্ধ্যায় নগরের জেএম সেন হলে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর রেডিসন ব্লুতে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভা করবেন। এই সভায় তৃণমূলের নেতারা সরাসরি দলীয় প্রধানের সামনে নিজেদের মতামত, পরামর্শ ও স্থানীয় রাজনীতির বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। সব মিলিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের এবারের সফরটি ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার এবং তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও তারেক রহমানের মাতা বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া জেএম সেন হলে জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে এসেছিলেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে উৎসাহ–উদ্দীপনা বিরাজ করছে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝে। উচ্ছ্বাস দেখা গেছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মাঝেও। প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করতে প্রস্তুত চট্টগ্রামবাসী। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। নগর ও জেলায় নেওয়া হয়েছে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ, এসআরবি, আনসার ও বিজিবির ২০ হাজারের বেশি সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন।
সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, এরশাদ উল্লাহ এমপি, আবু সুফিয়ান এমপি, সাঈদ আল নোমান এমপি, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা গত কয়েকদিন ধরে জেএম সেন হল পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। প্রশাসন বৈঠক করেছে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে।
যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ এবারের সফর : বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, গত আগস্টে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য চট্টগ্রাম আসেন প্রধানমন্ত্রী। এবার দুর্গাপূজায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পাশে উপস্থিত হচ্ছেন। এই দুই ঘটনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জনমুখী নেতৃত্বের পরিচয় দেয়। সংকটে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এবং উৎসবে আনন্দ ভাগাভাগি করার এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মাঝে তার নেতৃত্বের একটি ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভাবমূর্তি গড়ে তুলবে।
সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, কোনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনে এই ধরনের আগমন চট্টগ্রামে প্রথম। তাই তারেক রহমানের আগমন কেবল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, বরং একটি অসাম্প্রদায়িক, সাম্য ও সম্প্রীতির রেইনবো নেশন বা রংধনু জাতি গঠনের বাস্তবিক প্রতিফলনের অংশ। এই সফর চট্টগ্রামের সম্প্রীতির বার্তা আরও সুদৃঢ় করবে।
চট্টগ্রাম–১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান আজাদীকে বলেন, ১৯৯৩ সনে আমার বাবা আবদুল্লাহ আল নোমানের (সাবেক মন্ত্রী) প্রচেষ্টায় এবং আমন্ত্রণে জেএম সেন হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এসেছিলেন। তার ৩৩ বছর পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একক সিদ্ধান্তে একটি বিরল উদাহরণ সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ উৎসবে যোগদান করছেন। বাংলাদেশ যদি একটি শরীর হয়, রাষ্ট্র যদি একটি দেহ হয়, সেই দেহের অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তারা মন খুলে আমাদেরকে আস্থায় রেখে ভোট দিয়েছেন। সেটার প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন, সম্মান প্রদর্শন, কৃতজ্ঞতা এবং তাদের কথা শোনা, তাদের জন্য কিছু করা; তার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি প্রধানমন্ত্রীর আগমনে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সাংগঠনিক সভাও করবেন। সাংগঠনিক শক্তি আমাদের জনগণের জন্যই বেশি প্রয়োজন। কেননা সংগঠন দৃঢ় থাকলে জনগণ শক্তি পায়, জনগণ লিডারশিপ দেখে সমাজের ভালো কাজগুলোতে। সেজন্য সংগঠনকে শক্তিশালী রাখা, সংগঠনের সাথে অর্থাৎ তৃণমূলের সাথে সম্পর্ক জোরদার করা বা সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জায়গা থেকেও উদ্যোগের একটা অংশ এই সাংগঠনিক সভা। তাই পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সাংগঠনিক সভা দুটোই সাধুবাদযোগ্য।
কথা বলার সুযোগ পাবেন তৃণমূলের কর্মীরা : পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রেডিসন ব্লুতে অনুষ্ঠেয় সাংগঠনিক সভায় অংশ নেবেন। সভায় চট্টগ্রামের তিনটি সাংগঠনিক ইউনিটের (চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা) পূর্ণাঙ্গ কমিটির সকল সদস্য উপস্থিত থাকার সুযোগ পাবেন। তৃণমূলের সংগঠকদের মূল্যায়ন করার এই উদ্যোগ পুরো দলকে পুনরুজ্জীবিত ও নতুন গতিতে চাঙ্গা করে তুলবে বলে মনে করছেন বিএনপির স্থানীয় জ্যেষ্ঠ নেতারা।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম আজাদীকে বলেন, পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় অংশ নেবেন। সভায় মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি অংশ নেবে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সুপার ফাইভ অংশ নেবেন। থাকবেন সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। যেহেতু চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপিতে সাংগঠনিক কমিটি নেই, তাই সেখানকার সিনিয়র নেতৃবৃন্দ অংশ নিবেন।
মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান আজাদীকে বলেন, সাংগঠনিক সভাকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ–উদ্দীপনার কমতি নেই। জেএম সেন হলের বিষয়ে কড়া নির্দেশনা হচ্ছে, সেখানে যারা ধর্ম পালন করতে আসবেন, তাদেরকেই জায়গা দিতে হবে। আমাদের দলের নেতাকর্মীদের কোনো জায়গা ওখানে হবে না। কিন্তু সাংগঠনিক সভায় যাওয়ার আগ্রহ সবার মধ্যেই আছে। উৎসাহ–উদ্দীপনা আছে। কিন্তু সেখানে যেহেতু জায়গা লিমিট এবং একটা ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে থাকতে হবে, এজন্য আমরা সবাইকে সাংগঠনিক সভায় আমন্ত্রণ জানাতে পারব না। এজন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। আমাদের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী আছেন, যাদেরকে হয়তোবা ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল হচ্ছে না বলে ডাকতে পারছি না। এজন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে দলের মেম্বার সেক্রেটারি হিসেবে দুঃখ প্রকাশ করছি এবং ক্ষমা প্রার্থনা করছি তাদের কাছে।
সামগ্রিক প্রস্তুতি বিষয়ে তিনি বলেন, দুটো অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। গত আগস্টে সাংগঠনিক সভায় দলের অনেক নেতাকর্মীর আত্মীয়স্বজন ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তার উপস্থিত থাকা নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। এবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাভিত্তির শঙ্কা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, গতবারের চেয়ে এবার উপস্থিতি কম থাকবে। সবাইকে শক্তভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, কেউ যেন আত্মীয়স্বজনকে না আনেন।
নিরাপত্তা প্রসঙ্গ : সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী সাংবাদিকদের বলেন, পূজামণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে প্রটোকল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয় রয়েছে।
এসআরবি–৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে এসএসএফের নির্দেশনা ও সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। র্যাব, পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পূজামণ্ডপগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন, মোবাইল টহল ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি থাকবে। পাশাপাশি প্রস্তুত থাকবে বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্স। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।