ঢাকা | বঙ্গাব্দ

প্রয়োজনের চেয়ে ৪৪ শতাংশ কম গ্যাস পাচ্ছে চট্টগ্রাম

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jul 29, 2026 ইং
প্রয়োজনের চেয়ে ৪৪ শতাংশ কম গ্যাস পাচ্ছে চট্টগ্রাম ছবির ক্যাপশন: প্রয়োজনের চেয়ে ৪৪ শতাংশ কম গ্যাস পাচ্ছে চট্টগ্রাম
ad728
নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম) 
চট্টগ্রামে গ্যাসে এ মুহূর্তে কোনো সুখবর নেই। আগামী ১ আগস্টের পরে পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি ঘটতে পারে। তবে ১১ আগস্টের আগে পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার আশা নেই। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ড ও যান্ত্রিক ক্রুটির কারণে এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় দেশের জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। এর বড় ধাক্কা লেগেছে আমদানিকৃত এলএনজিনির্ভর চট্টগ্রামে। দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ কম গ্যাস পাচ্ছে বন্দরনগরী। এর ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ, সার কারখানা, সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আবাসিক খাত পর্যন্ত সর্বত্র গ্যাসের সংকট চলছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। গ্যাসের অভাবকে পুঁজি করে সিএনজিচালিত টেক্সি ভাড়া ইচ্ছেমতো হাঁকা হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রান্নার চুলায়ও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে রপ্তানিমুখী শিল্প, উৎপাদন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এবং এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির চাপ সামাল দিতে বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ কমানো হচ্ছে। তবে চট্টগ্রাম যেহেতু নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনের গ্যাস দেওয়া হয় না, পুরোপুরি এলএনজিনির্ভর, তাই এখানকার সংকট তুলনামূলকভাবে বেশি। জানা গেছে, মহেশখালীতে স্থাপিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি পরিচালনা করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এঙিলারেট এনার্জি এবং অপরটি পরিচালনা করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি। এক সপ্তাহ আগে গত মঙ্গলবার এঙিলারেট পরিচালিত টার্মিনালের একটি বয়লারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর পুরো টার্মিনালটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের চেষ্টা করেও সফল হননি। বিদেশ থেকে প্রকৌশলী এনেও চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি। কবে নাগাদ টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, টার্মিনালটিতে দুটি বয়লার রয়েছে। আগুনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যটি সচল করা গেলে অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। প্রকৌশলীরা সেটি চালুর চেষ্টা করছেন। আগামী ১ আগস্ট নাগাদ ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি ঠিক হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, বিদেশ থেকে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি আনা হচ্ছে। ওগুলো লাগানো হলে একটি বয়লার চালু করে অন্তত তিনশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে টার্মিনালটি। তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি কার্যকর হতে আগামী ১১ আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে ১১ আগস্টের আগে চট্টগ্রামসহ দেশে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ আসার সুযোগ নেই।

গ্যাস সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত। রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) বন্ধ রয়েছে। কেবল কাফকোতে সার উৎপাদন চলছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় কাটছাঁট করা হয়েছে। বর্তমানে শুধু শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সীমিত আকারে উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। এই কেন্দ্রে দৈনিক ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়ছে। চট্টগ্রামে বিদ্যুতের লোডশেডিং বিরক্তিকর পর্যায়ে ঠেকেছে।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ও সার খাতের জন্য গ্যাস বরাদ্দ দেওয়ার পর অবশিষ্ট প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিয়ে শিল্প, বাণিজ্যিক, আবাসিক এবং সিএনজি সব খাতের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু এত অল্প গ্যাস দিয়ে পুরো নেটওয়ার্কে চাপ ধরে রাখা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে দূরবর্তী এলাকা তো বটেই, নগরীর কেন্দ্রীয় এলাকাতেও গ্যাসের চাপ কমে গেছে।

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। অনেক স্টেশন পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। এর প্রভাব ইতোমধ্যে গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন এবং নগরজীবনে পড়তে শুরু করেছে।

পরিবহন–সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। গ্যাস সংকটের কারণে ইতোমধ্যে টেঙিগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় বয়লার স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে স্টিল, রি–রোলিং, কাচ, সিরামিক, টেঙটাইল, স্পিনিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিভিন্ন মাঝারি শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পে সময়মতো উৎপাদন শেষ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
সূত্র জানিয়েছে, স্বাভাবিক অবস্থায়ও চট্টগ্রামের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে ২৭০ থেকে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। সংকট শুরুর আগেও চট্টগ্রামে ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেয়া হচ্ছিল। বর্তমানে আরো কমিয়ে ২২৫ থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন না বাড়লে এবং এলএনজি আমদানি ও রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা আরো সম্প্রসারণ না করলে গ্যাস সংকট সহজে কাটবে না। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমছে। সেই ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লেও এলএনজির উচ্চমূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মহেশখালীর একটি টার্মিনালে সাময়িক দুর্ঘটনা যে পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি তারই উদাহরণ।

কেজিডিসিএলের শীর্ষ এক কর্মকর্তা আজাদীকে বলেন, এই মুহূর্তে কোনো সুখবর নেই। ভাসমান টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা কম। বরং জাতীয় চাহিদা বিবেচনায় অন্য অঞ্চলে সরবরাহ বাড়াতে হলে চট্টগ্রামে আরো কাটছাঁট করতে হতে পারে। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় গ্যাস সরবরাহ অগ্রাধিকার দিতে হলে চট্টগ্রামের শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করবে।



নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ