খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:
‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান; টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান’এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে খাগড়াছড়িতে র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার পেরাছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয়, খাগড়াছড়ির উদ্যোগে এবং হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও জাবারাং কল্যাণ সমিতির সহযোগিতায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে একটি বর্ণাঢ্য সচেতনতামূলক র্যালি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও আশপাশের সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে বিদ্যালয় মিলনায়তনে মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব, শিশু পুষ্টি এবং মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন পেরাছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিম্বিসার খীসা। প্রধান অতিথি ও মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. প্রতীম চাকমা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ রিমি চাকমা, জাবারাং কল্যাণ সমিতির Access to and Utilization of Lifesaving Services by Marginalized Communities in Chittagong Hill Tracts in Bangladesh প্রকল্পের প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর বিনোদন ত্রিপুরা, বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক লায়স দেওয়ান এবং সহকারী শিক্ষক নিপা মারমা।
স্বাগত বক্তব্যে প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর বিনোদন ত্রিপুরা বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে মাতৃদুগ্ধের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ ও সচেতন করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পুষ্টি বিশেষজ্ঞ রিমি চাকমা ‘গোল্ডেন থাউজ্যান্ড ডেইজ’-এর গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, শিশুর জন্মের প্রথম এক হাজার দিন তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। তিনি নবজাতককে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের প্রথম দুধ বা শাল দুধ পান করানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এই দুধ শিশুর জন্য প্রথম প্রাকৃতিক প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মাতৃদুগ্ধ পান করানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
সহকারী শিক্ষক নিপা মারমা নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, এখনও অনেক পরিবারে গর্ভকালীন পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ নিয়ে নানা ধরনের কুসংস্কার রয়েছে। এসব ভুল ধারণা দূর করে বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যচর্চা নিশ্চিত করতে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সিনিয়র সহকারী শিক্ষক লায়স দেওয়ান বলেন, মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পুষ্টিকর খাদ্য, পর্যাপ্ত আমিষ গ্রহণ এবং মাতৃদুগ্ধের কোনো বিকল্প নেই। তিনি মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধান অতিথি ডা. প্রতীম চাকমা বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের ইতিহাস ও তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, মাতৃদুগ্ধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, অপুষ্টি কমানো এবং সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি বলেন, সরকারের স্বাস্থ্যখাতে সাম্প্রতিক বাজেট বরাদ্দ ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করতে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাতে অধিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে প্রধান শিক্ষক বিম্বিসার খীসা আয়োজক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, এ ধরনের সচেতনতামূলক আয়োজন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি তাদের পরিবার ও সমাজেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জাবারাং কল্যাণ সমিতির ফিল্ড কোঅর্ডিনেটর পিংকী রানী ত্রিপুরা।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্বব্যাপী বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালন করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে মাতৃদুগ্ধ পান করানো, প্রথম ছয় মাস শুধুমাত্র মাতৃদুগ্ধ নিশ্চিত করা এবং দুই বছর বা তারও বেশি সময় বয়স পর্যন্ত উপযুক্ত পরিপূরক খাবারের পাশাপাশি মাতৃদুগ্ধ পান অব্যাহত রাখার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ উদ্যোগ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন, শিশু অপুষ্টি হ্রাস এবং মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট