নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
অপরিকল্পিত নগরায়ণে চট্টগ্রাম শহর থেকে উধাও হয়েছে বহু খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গা। মাঠের অভাবে খেলতে পারে না শিশু–কিশোর। ফলে চার দেওয়ালে বন্দি শৈশব আজ মোবাইল ও ইন্টারনেট–এ আসক্ত। মাদকেও ঝুঁকছেন অনেকে। যা শিশু–কিশোরদের শারীরিক–মানসিক বিকাশ ও সামাজিক সুরক্ষাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে কংক্রিটের শহরে খেলার নতুন দুয়ার খুলছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। ইট–কাঠের খাঁচায় বন্দি শৈশবকে খেলাধূলার আলোয় ফেরাতে ২০টি ফুটসাল নির্মাণ করবে সংস্থাটি। এজন্য ৪৯ কোটি টাকায় ‘চট্টগ্রাম মহানগরে আধুনিক নগর ক্রীড়া সুবিধা সমপ্রসারণ ও ফুটসাল মাঠ নির্মাণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্পও নিয়েছে সংস্থাটি। গত সপ্তাহে অনুমোদনের জন্য প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, সারা দেশে শহর ও গ্রাম অঞ্চলে খেলার মাঠের সংকট দূর করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ফুটসাল নির্মাণে উদ্যোগ নেয়। সর্বশেষ গত ২৪ আগস্ট এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে একটি সভা হয়। ওই সভায় সারা দেশের সিটি কর্পোরেশনগুলো থেকে ফুটসাল নির্মাণে দ্রুত প্রকল্প তৈরি করে পাঠানো হয়। এর প্রেক্ষিতে ‘চট্টগ্রাম মহানগরে আধুনিক নগর ক্রীড়া সুবিধা সমপ্রসারণ ও ফুটসাল মাঠ নির্মাণ প্রকল্প’টি গ্রহণ করে চসিক। চূড়ান্ত অনুমোদন শেষে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করবে অর্থ মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে খালি জায়গার তীব্র সংকট থাকায় প্রথাগত বড় মাঠের তুলনায় কম জায়গায় বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য ‘ফুটসাল’ যুগোপযোগী উদ্যোগ। চসিকের সংশ্লিষ্টরা কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিত জায়গায় অধিক সংখ্যক তরুণকে ক্রীড়া কার্যক্রমে যুক্ত করার জন্য ফুটসালের মতো তুলনামূলক কম স্থান–নির্ভর, বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য ও সারা বছর ব্যবহারোপযোগী স্থাপনা অত্যন্ত কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা বিশ্বের অনেক ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এরমধ্যে সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, একসময় চট্টগ্রামে মাঠ ছিল, খেলাধূলা জনপ্রিয় ছিল। যুবক ও তরুণদের খেলার প্রতি মোটামুটি আকর্ষণ ছিল। কিন্তু এখন আমরা দেখছি কিশোর গ্যাং তৈরি হয়েছে। যার কারণে তারা মাদকাসক্তিসহ খুন–খারাবিতে জড়িয়ে পড়ছে। সেই সোসাইটিকে আগের জায়গায় নিয়ে আসার জন্য ৪১ ওয়ার্ডে আমি ৪১ টা খেলার মাঠ করে দিব বলেছিলাম। আর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থার যেসব মাঠ আছে সেগুলো সংস্কার করে দিব। সেই প্রেক্ষিতে বেশ কিছুৃ মাঠের কাজ চলছে। মহসীন কলেজের মাঠ সংস্কারেও কাজ চলছে।
চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিন আজাদীকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বৈঠকে ফুটসাল নির্মাণে আমাদের দ্রুত প্রকল্প জমা দিতে বলা হয়। এরপ্রেক্ষিতে ২০টি ফুটসাল নির্মাণে প্রকল্প জমা দিয়েছি। এটা পাইলট প্রকল্প। প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ নির্মাণে আলাদা প্রকল্প নেয়া হবে। যেসব ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত জায়গা নেই, সেখানে অন্তত দুটি ওয়ার্ডের মাঝখানে একটি খেলার মাঠ তৈরি করা হবে।
সম্ভাব্য স্থান : প্রকল্পের আওতায় যে ২০ মাঠে মাঠে ফুটসাল নির্মাণে প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে– ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের বেগমজান স্কুল মাঠ ও মেহের আফজাল মাঠ, ৩৭ নং ওয়ার্ডের জরিনা মফজল স্কুল মাঠ, ৪০ নং ওয়ার্ডের পতেঙ্গা হাইস্কুল মাঠ, ১৬ নং ওয়ার্ডের প্যারেড মাঠ, ৩০ নং ওয়ার্ডের বালুর মাঠ ও মাইলের বিল কলোনির মাঠ, ১৭ নং ওয়ার্ডের বাকলিয়া স্কুল মাঠ, ১৩ নং ওয়ার্ডের পাহাড়তলী কলেজ মাঠ, আম বাগান সমাজকল্যাণ মাঠ ও ডিজেল কলোনী মাঠ, ২ নং ওয়ার্ডের শেরশাহ মাঠ, ৪ নং ওয়ার্ডের চাঁদগাঁও আবাসিক বি–ব্লকের মাঠ, ৩৪ নং ওয়ার্ডের সেন্ট প্ল্যাসিড স্কুল মাঠ, ৩১ নং ওয়ার্ডের মনোহর খালী মাঠ, ৭ নং ওয়ার্ডের আমিন কলোনির মাঠ, ৮ নং ওয়ার্ডের ফরেস্ট মাঠ, ৩৫ নং ওয়ার্ডের বাকলিয়া স্টেডিয়াম মাঠ, ১৪ নং ওয়ার্ডের বাটালী হিল মাঠ ও ১০ নং ওয়ার্ডের উত্তর কাট্টলী সাগর পাড়ের মাঠ। প্রতি ফুটসাল হবে ১ হাজার ৭৮৫ বর্গমিটারের।
এদিকে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনায় বলা হয়, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগরী ও প্রধান বাণিজ্যিক–বন্দরনগরী হিসেবে গত কয়েক দশকে দ্রুত নগরায়ণের মধ্য দিয়ে গেছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি, আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনার সমপ্রসারণ এবং ভূমির মূল্য বৃদ্ধির ফলে নগরীর অধিকাংশ ওয়ার্ডে ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বহু পুরনো খেলার মাঠ বেদখল হয়ে যাওয়া, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শিশু–কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত ক্রীড়াঙ্গনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সমপ্রতি নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে খেলার মাঠ নির্মাণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার একটি দৃষ্টান্ত হলো ঐতিহ্যবাহী আগ্রাবাদ জাম্বুরি মাঠের সংস্কার ও আধুনিকায়ন কার্যক্রম। তবে নগরীর সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় বিদ্যমান ক্রীড়া অবকাঠামো এখনও অপ্রতুল।
এছাড়া ‘আধুনিক নগর ক্রীড়া সুবিধা সমপ্রসারণ ও ফুটসাল মাঠ নির্মাণ প্রকল্প’র মূল লক্ষ্য হচ্ছে– বিভিন্ন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত সংখ্যক আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ফুটসাল মাঠ ও ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে শিশু–কিশোর, তরুণ ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও শারীরিক সক্রিয়তার সুযোগ সৃষ্টি করা, এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি ক্রীড়া–বান্ধব, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলা।
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট