নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইনখ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিনদিন প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। এর মধ্যে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে মহাসড়কের কুমিল্লার ১০৫ কিলোমিটার অংশে। থ্রি-হুইলারের অবাধ চলাচল, অনিয়ন্ত্রিত গতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার এবং অপরিকল্পিত সড়কব্যবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ। বিশেষ করে ঈদযাত্রা কিংবা ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, ১৭ মাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত ২০৬ কিলোমিটার সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫১০ জন। শুধু এ বছর ঈদুল ফিতরের ছুটির মাত্র চার দিনে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিং এবং কালাকচুয়ায় বড় দুই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৭ জন।
হাইওয়ে পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কুমিল্লা অঞ্চলের আওতায় ৫৯৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৪১ জন নিহত এবং ৬৪৮ জন আহত হয়েছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই ৩৫৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জন এবং আহত হন ৩৭৭ জন। হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, মহাসড়কের কুমিল্লার অংশে শতশত প্রাণহানি ও দুর্ঘটনার পেছনে একাধিক কারণ একযোগে কাজ করছে। অনিয়ন্ত্রিত গতি, থ্রি-হুইলারের অবাধ চলাচল, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ ইউটার্ন, সড়কে হঠাৎ পারাপার, ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারে অনীহা, চালকদের অসচেতনতা, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতাসহ ১২ থেকে ১৩টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসাবে অসচেতনতাকেই দায়ী করছে পুলিশ।
হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চালক, যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। সড়ক ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
এদিকে সম্প্রতি কুমিল্লায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৮৬ জনের পরিবারের মাঝে বিআরটিএ ট্রাস্টি বোর্ডের আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, দেশে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন। এটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইন বাস্তবায়ন, নজরদারি বৃদ্ধি এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক-মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন বাস এবং অদক্ষ চালক পরিহার করতে হবে।
অন্যদিকে যাত্রী ও চালকদের অভিযোগ, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে থ্রি-হুইলারের দৌরাত্ম্য, বেপরোয়া গতি এবং অনিয়ন্ত্রিত পারাপার দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের মতে, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে মহাসড়কে প্রাণহানি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আর সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। সার্ভিস লেনসহ মহাসড়ককে ১০ লেনে উন্নীত করা, ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্ন অপসারণ, অবৈধ থ্রি-হুইলার নিয়ন্ত্রণ এবং পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে।
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট