নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) ৪০ হাজার সেট ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থায়ন ও অর্থের লেনদেনের অভিযোগে সংগঠনটির প্রধান নাথান বমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডির অনুসন্ধানে কেএনএফের ৪০ হাজার সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম তৈরির ফ্যাব্রিক ও সেলাইয়ের কাজ বাবদ মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
বুধবার (৮ অক্টোবর) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বিষয়গুলো গণমাধ্যমকে অবগত করেন।
মামলায় অভিযুক্তরা হলেন—কেএনএফের প্রধান নাথানা লনচেও ওরফে নাথান বম (৪৯), মংহলাসিন মারমা ওরফে মং (৩৮), নিয়াজ হায়দার (৩৯), মো. গোলাম আজম (৪৭), সাহেদুল ইসলাম (২৭), মোহাম্মদ কামরুজ্জামান (৫৮), জামালুল ইসলাম (৪৫), মো. তৌহিদুল ইসলাম (৩৮) ও মো. মতিউর রহমান (৪৩)।
সিআইডি জানায়, ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ১৮ মে। ওইদিন রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একটি বিশেষ দল বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন মোজাফফরনগর আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে কেএনএফের পোশাক প্রস্তুতের সঙ্গে জড়িত একজনকে আটক করে।
পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হালিশহর থানাধীন ছোটপুল এলাকার দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আরও দুজনকে আটক করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই করে বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন একটি গোডাউন ও একটি গার্মেন্টস কারখানায় অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার ৩০০ সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ কেএনএফের ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়।
এর মধ্যে একটি গোডাউন থেকে ১১ হাজার ২০০ সেট এবং একটি কারখানা থেকে ৯ হাজার ১০০ সেট ইউনিফর্ম জব্দ করা হয়। প্রতিটি সেটে ছিল একটি শার্ট ও একটি প্যান্ট। এ ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়।
পরবর্তীতে কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি। এ সময় ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ অর্থ প্রদান, ক্রয়াদেশ, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে অর্থের উৎস, ব্যবহার ও প্রবাহের তথ্য অনুসরণ করা হয়।
সিআইডির অনুসন্ধানে পাওয়া নথি ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণে জানা যায়, কেএনএফের প্রতিনিধি হিসেবে মংহলাসিন মারমা ওরফে মং প্রথমে নিয়াজ হায়দারের সঙ্গে এবং পরে তার মাধ্যমে গোলাম আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর তারা ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেএনএফের ইউনিফর্মের ক্যামোফ্লেজ প্রিন্টের ফ্যাব্রিক তৈরির ব্যবস্থা করেন।
সিআইডির দাবি, মংহলাসিন মারমা নিজেকে এমআই এন্টারপ্রাইজের সহকারী কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিয়ে ২০২৪ সালের ২০ নভেম্বর ও ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুটি পারচেজ অর্ডার দাখিল করেন। এসব কাজের বিপরীতে ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডকে মোট ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ৪০ হাজার সেট ইউনিফর্মের শার্ট ও প্যান্ট সেলাইয়ের জন্য মংহলাসিন মারমার নির্দেশনায় নিয়াজ হায়দার ও গোলাম আজম তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ইউনিফর্ম সেলাইয়ের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে মোট ৭২ লাখ টাকা দেওয়া হয়।
সিআইডির আর্থিক অনুসন্ধানে কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় অর্থের একটি প্রবাহ শনাক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, চেক ও নগদ অর্থের মাধ্যমে মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা ফ্যাব্রিক তৈরিতে এবং ৭২ লাখ টাকা ইউনিফর্ম সেলাইয়ে ব্যয় করা হয়।
সিআইডি বলছে, অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনায় কেএনএফের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নাথান বমের নির্দেশনায় মংহলাসিন মারমাসহ অন্য অভিযুক্তরা পারস্পরিক যোগসাজশে সংগঠনটির জন্য বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম তৈরির উদ্যোগ ও অর্থায়ন করেন বলে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
এছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রমে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এসব ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থের হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
এ ঘটনায় ৭ অক্টোবর বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা নম্বর-১৩ দায়ের করা হয়। মামলায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে।
সিআইডি জানায়, মামলাটির তদন্তে কেএনএফের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য অর্থের উৎস ও প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন, অর্থ প্রদানের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এ আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট