ঢাকা | বঙ্গাব্দ

খাগড়াছড়িতে স্বাস্থ্যসেবায় সংকট ১২৩ পদ শূন্য রেখে ৫৪ নার্স বদলির আদেশ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : May 9, 2026 ইং
খাগড়াছড়িতে স্বাস্থ্যসেবায় সংকট ১২৩ পদ শূন্য রেখে ৫৪ নার্স বদলির আদেশ ছবির ক্যাপশন: স্বাস্থ্য সেবা ভেঙে পড়ার শঙ্কা
ad728
প্রবীর সুমন//খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:
দুর্গম পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে আগে থেকেই নার্স সংকট চলমান। এর মধ্যেই যোগদানের সাত মাস না পেরোতেই জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৫৪ জন নার্সকে একযোগে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে জেলায় মোট শূন্য পদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১২৪-এ। এমন পরিস্থিতিতে পাহাড়ি অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি, শিশু রোগীর চাপ এবং চলমান টিকাদান কর্মসূচির সময় এই গণবদলির সিদ্ধান্তকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টরা।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, খাগড়াছড়ি জেলায় নার্সের মোট অনুমোদিত পদ ৩৪১টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন ২৭২ জন। অর্থাৎ আগে থেকেই ৬৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এখন নতুন করে আরও ৫৪ জন নার্সের বদলির আদেশ কার্যকর হলে মোট শূন্যপদের সংখ্যা দাঁড়াবে ১২৩টিতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই পার্বত্য অঞ্চলে চিকিৎসক ও নার্স সংকট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা ও জীবনযাত্রার নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সমতল এলাকার অনেক চিকিৎসক ও নার্স পাহাড়ে দীর্ঘ সময় চাকরি করতে আগ্রহী হন না। ফলে সীমিত জনবল দিয়েই বছরের পর বছর স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ৫৪ জন নার্সের প্রথম পোস্টিং দেওয়া হয়। কিন্তু যোগদানের মাত্র সাত মাসের মাথায় চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগ থেকে তাদের অন্যত্র বদলির আদেশ জারি করা হয়। প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ও উপসচিব বদরুল আলম স্বাক্ষরিত ওই আদেশে ২৬ এপ্রিলের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

চিকিৎসকরা জানান, বর্তমানে জেলা সদর হাসপাতালসহ জেলার প্রায় সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সীমিত জনবল নিয়ে কোনোমতে স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই নতুন করে একাধিক নার্স বদলি হওয়ায় প্রসূতি বিভাগ, জরুরি বিভাগ, ইনডোর রোগীদের সেবা, টিকাদান কার্যক্রম, ইনজেকশন ও ড্রেসিংসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় ও দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা জানান, পাহাড়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট থাকায় অনেক ক্ষেত্রে নার্সদের ওপরই রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও সেবার বড় অংশ নির্ভর করে। বিশেষ করে প্রসূতি মা, শিশু ও জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে নার্সদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিকল্প জনবল ছাড়া গণহারে বদলি জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রশাসনিক সূত্র জানায়, বদলির আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নেওয়ার নিয়ম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। একই সঙ্গে বদলি কার্যক্রমে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনও উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তাছাড়া নিয়ম অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলে কর্মরত কোনো চিকিৎসক বা নার্স বদলি হতে চাইলে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। পরে তা সিভিল সার্জনের সুপারিশসহ পার্বত্য জেলা পরিষদে পাঠানো হয় এবং নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে বদলি কার্যকর হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বদলিকৃত অনেক নার্স সরাসরি অনলাইনে আবেদন করে বদলি নিয়েছেন।

বদলীর আদেশ হওয়ার পর পর দীঘিনালা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুইজন এবং জেলা সদর হাসপাতালের একজন নার্স ছাড়পত্র ছাড়াই নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেছেন বলেও জানা গেছে, যা সরকারি চাকরি বিধিমালার পরিপন্থি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ছাড়পত্র দিতে বিভিন্ন মহল থেকে চাপ প্রয়োগের অভিযোগও উঠেছে।

খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, “আমাদের হাসপাতালে নার্সসহ বেশিরভাগ সেক্টরেই জনবল সংকট রয়েছে। ১৩৫ জন নার্সের বিপরীতে বর্তমানে ২০টি পদ শূন্য। এখন আবার নতুন করে বদলি হলে সংকট আরও বাড়বে এবং স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হবে।”

খাগড়াছড়ির ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. রতন খীসা বলেন, “খাগড়াছড়ি অত্যন্ত দুর্গম এলাকা। জেলায় নার্সের মোট ৩৪১টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ২৭২ জন। অর্থাৎ আগে থেকেই ৬৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এখন আরও ৫৪ জন নার্সের বদলির আদেশ হওয়ায় মোট শূন্যপদের সংখ্যা দাঁড়াবে ১২৩-এ। এতে পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”

তিনি আরও বলেন, “যেসব হাসপাতালে সীমিত জনবল দিয়ে ২৪ ঘণ্টা সেবা চালু রাখা হচ্ছে, সেখানে একসাথে এত সংখ্যক নার্স চলে গেলে স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, আমরা সিভিল সার্জন অফিসের সুপারিশ পেলে কাগজ পত্র যাচাই বাছাই করে ছাড়পত্র দিয়ে থাকি। তবে এতগুলো পদ খালি রেখে একসাথে অনেকগুলো নার্সের বদলীর আদেশে খাগড়াছড়ির স্বাস্থ্য সেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমরা তা যাচাই-বাছাই করে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবো। 

নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
আমাদের জীবিত কিংবদন্তি দিলারা জামান...

আমাদের জীবিত কিংবদন্তি দিলারা জামান...