প্রতিবেদন: কাজী সাঈদ
দৈনিক চট্টগ্রাম পোস্ট
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (চমেক) দীর্ঘদিন ধরে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তম সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন হাজারো রোগী ও স্বজনের আনাগোনায় ব্যস্ত এই হাসপাতালকে ঘিরে বহু বছর ধরে অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা নিয়ে নানা অভিযোগ, অসন্তোষ ও বিতর্কের কথা শোনা যায়। সম্প্রতি হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বাইরের অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ সীমিত করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
নতুন সিদ্ধান্ত, পুরনো বিতর্ক
অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইউসুফ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হাসপাতালের ভেতরে বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতে পারবে না। তবে রোগীর নিজস্ব গাড়ি থাকলে সেটি ব্যবহার করে রোগী বা মরদেহ পরিবহন করা যাবে।
এই সিদ্ধান্তের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। একপক্ষ দাবি করছে, এটি শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্যোগ। অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, এর ফলে হাসপাতালকেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী অ্যাম্বুলেন্স চক্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
কী অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের?
বিভিন্ন রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই হাসপাতাল থেকে রোগী বা মরদেহ পরিবহনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের জন্য চাপের অভিযোগ উঠেছে।
কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, তাদের পরিচিত বা আত্মীয়ের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স থাকা সত্ত্বেও হাসপাতাল এলাকা থেকে সরাসরি রোগী বা মরদেহ নিতে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাইরের অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে গেলেও বিভিন্ন ধরনের অনুমতি বা ফি প্রদানের অনানুষ্ঠানিক চাপ সৃষ্টি করা হতো।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
ভাড়ার বিষয়ে অসন্তোষ
চমেকের সামনে অবস্থানরত বিভিন্ন অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। রোগীর স্বজনদের দাবি, জরুরি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অনেক সময় দূরত্বের তুলনায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়।
স্থানীয় স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীদের মতে, হাসপাতালভিত্তিক অ্যাম্বুলেন্স সেবায় স্বচ্ছ ভাড়া তালিকা, ডিজিটাল মনিটরিং এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা না থাকলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
প্রশাসনের ভূমিকা কতটা কার্যকর?
প্রশ্ন উঠেছে, হাসপাতাল প্রশাসন, জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি দীর্ঘদিনের এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখেছে?
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তি তার নিজস্ব বা পছন্দের অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে না পারেন, তবে সেটি নাগরিক অধিকার ও সেবার স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা জরুরি।
রাজনৈতিক বিতর্ক বনাম বাস্তব সমস্যা
সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক পক্ষ-বিপক্ষ অবস্থানও দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পক্ষ একে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত হাসপাতালকেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্স সেবার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এবং রোগী-স্বজনদের স্বাধীনভাবে সেবা গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে প্রকৃত সমস্যাটি চাপা পড়ে গেলে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সুধীমহলের পরামর্শ :
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেছেন:
হাসপাতাল এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন।
নির্ধারিত ভাড়া তালিকা প্রকাশ ও বাধ্যতামূলক প্রদর্শন।
বাইরের নিবন্ধিত অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে অযৌক্তিক বাধা অপসারণ।
অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হটলাইন চালু।
জেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন সংস্থার মাধ্যমে স্বাধীন তদন্ত।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। অভিযোগগুলো কতটা সত্য, কোথায় অতিরঞ্জন, আর কোথায় বাস্তব সমস্যা রয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া সম্ভব। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ কমাতে এবং সেবাখাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
— কাজী সাঈদ
স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক চট্টগ্রাম পোস্ট
দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট