ঢাকা | বঙ্গাব্দ

চন্দনাইশের বিখ্যাত কাঞ্চনপেয়ারা রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 14, 2026 ইং
চন্দনাইশের বিখ্যাত কাঞ্চনপেয়ারা রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ছবির ক্যাপশন: চন্দনাইশের বিখ্যাত কাঞ্চনপেয়ারা রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে
ad728

নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘কাঞ্চন পেয়ারা’র খ্যাতি এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতেই আটকে নেই। অতুলনীয় স্বাদ, আকর্ষণীয় রং, ফলের গড়ন ও দীর্ঘ সময় সতেজ থাকার কারণে এই পেয়ারা এখন জায়গা করে নিয়েছে বিদেশের বাজারেও।
ভরা মৌসুমের শুরুতেই প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি কাঞ্চন পেয়ারা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নানা দেশে। এতে কৃষকের মুখে যেমন হাসি ফুটেছে, তেমনি দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও সম্ভাবনাময় এই দেশীয় ফল নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।

ইতিমধ্যে গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে বাজারে পুরোদমে আসতে শুরু করেছে কাঞ্চন পেয়ারা। জুলাই মাস থেকেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে এর বিক্রি চলছে। বাগান থেকে ফল সংগ্রহ ও ব্যবসায়ীদের কাছে তা বিক্রির কাজে এখন চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন পেয়ারাচাষিরা।

স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চন্দনাইশের সমতল ও পাহাড়ি উর্বর মাটি এবং অনুকূল আবহাওয়ায় উৎপাদিত কাঞ্চন পেয়ারা দীর্ঘদিন ধরেই তার স্বাদ ও গুণগত মানের জন্য দেশজুড়ে সমাদৃত। বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা সরাসরি বাগান থেকেই পেয়ারা সংগ্রহ করছেন।
পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও যাচ্ছে চন্দনাইশের এই পেয়ারা। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে হওয়ায় পরিবহনব্যবস্থাও বেশ সহজ ও দ্রুত। ফলে আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে পেয়ারা সরবরাহ করতে সুবিধা হচ্ছে। চন্দনাইশের হাশিমপুর, কাঞ্চননগর, ধোপাছড়ি, দোহাজারী, জামিজুরীসহ পাহাড়ি ও সমতল এলাকার পাশাপাশি পাশের উপজেলা পটিয়ার বিশাল পাহাড়ি এলাকাতেও এখন পেয়ারার ব্যাপক চাষ হচ্ছে। প্রতিদিন ভোর থেকেই বাগান ও স্থানীয় বাজারগুলোতে বেচাকেনা জমে ওঠে এবং ট্রাক-পিকআপে করে তা দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলার হাশিমপুর, জঙ্গল হাশিমপুর, ছৈয়দাবাদ, লট এলাহাবাদ, দোহাজারী ও ধোপাছড়ি এলাকার পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে ৭২০ হেক্টর জমিতে পেয়ারা বাগান রয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ১১ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আগের তুলনায় কাঞ্চন পেয়ারার সামগ্রিক উৎপাদন কিছুটা কমেছে।

চাষিরা বলছেন, তুলনামূলক কম খরচে কাঞ্চন পেয়ারা চাষ করে ভালো আয় করা সম্ভব। ফলে প্রতিবছরই এই আবাদ বাড়ছে এবং বহু পরিবার সরাসরি এই চাষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। পেয়ারাচাষি মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, ‘অন্যান্য ফলের তুলনায় কাঞ্চন পেয়ারার উৎপাদন ব্যয় কম, অথচ বাজারমূল্য ভালো পাওয়া যায়। সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে ফলনও অনেক বেশি হয়।’ পাইকারি ব্যবসায়ী জসিম মিয়া জানান, স্বাদ ও মানের কারণে ক্রেতাদের কাছে এই পেয়ারার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাজারে আনার পর অল্প সময়েই তা বিক্রি হয়ে যায়।
কাঞ্চন পেয়ারার বিদেশের বাজারে চাহিদা বাড়লেও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফল ও সবজি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ফুডস অ্যান্ড ভেজিটেবলসের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ইসমাইল চৌধুরী হানিফ জানান, প্রায় ১০-১৫ বছর ধরে কাঞ্চন পেয়ারা বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকার কাঞ্চন পেয়ারা ও অন্যান্য জাতের পেয়ারা রপ্তানি হয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কাঞ্চন পেয়ারাকে রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য হিসেবে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করতে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন। মূলত দুটি দিকে জোর দেওয়া জরুরি– আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ব্যবস্থা, সংরক্ষণ সুবিধা ও কোল্ড চেইন অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে সম্ভাবনা অনুযায়ী রপ্তানি বাড়ানো যাচ্ছে না এবং চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মানসম্পন্ন শাকসবজি ও ফলমূল রপ্তানির জন্য আন্তর্জাতিক মানের ‘প্যাকিং হাউস’ নির্মাণ করা গেলে রপ্তানির পরিমাণ বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।

অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে এই ফল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুনা সাহা বলেন, ‘কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়লে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মস্থান ও কৃষকের আয় বাড়বে। আধুনিক চাষাবাদ ও রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে চন্দনাইশকে কৃষিপণ্য রপ্তানির একটি সম্ভাবনাময় হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।’

চন্দনাইশ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আজাদ হোসেন জানান, এই অঞ্চলের পেয়ারা আলাদা সুনাম অর্জন করেছে। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, সম্প্রতি বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে এসে কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চন্দনাইশে একটি আধুনিক হিমাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। হিমাগার নির্মিত হলে পেয়ারা দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।



নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
কালুরঘাট ফেরিঘাটের ইজারা কার্যক্রম স্থগিত করলেন হাইকোর্ট

কালুরঘাট ফেরিঘাটের ইজারা কার্যক্রম স্থগিত করলেন হাইকোর্ট