এম. আজগর সালেহী, চট্টগ্রাম।
ফটিকছড়ি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে রাতের আঁধারে নম্বরপ্লেটবিহীন ট্রাক ও ট্রাক্টর ব্যবহার করে প্রকাশ্যে মাটি কাটার মহোৎসব চললেও কার্যকর কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। দাঁতমারা, নারায়ণহাট, ভূজপুর, হারুয়ালছড়ি, পাইন্দং, সুয়াবিল, কাঞ্চনপুর, বেড়াজালি, নানুপুর ও বখতপুরসহ প্রায় পুরো উপজেলাজুড়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রাত জেগে ফসলি জমি ও পাহাড়ি এলাকা থেকে টপসয়েল কেটে নিচ্ছে চক্রটি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সারারাত ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে মাটি পরিবহনের সময় সড়কে মাটি পড়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কগুলো কর্দমাক্ত হয়ে পড়ছে। শেষ রাতে কুয়াশার সঙ্গে মাটি কাদায় পরিণত হয়ে সড়কগুলো মারাত্মক পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, যা যানবাহন চলাচলের জন্য অনুপযুক্ত এবং প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। অনেক স্থানে পিচঢালা সড়ক মাটির সড়কে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অবৈধ মাটি কাটার ফলে ফসলি জমির উর্বর টপসয়েল নষ্ট হচ্ছে, যা সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, একবার টপসয়েল কেটে নিলে ওই জমিতে দীর্ঘদিন ফসল ফলানো কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি পাহাড় ও ঢালু জমি থেকে মাটি কাটার কারণে ভূমিধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, রাতের বেলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযান ঠেকাতে সিন্ডিকেটটি উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে লোক বসিয়ে রাখে। এসব লোক আগাম বার্তা দিয়ে অভিযান ব্যর্থ করে দিচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মহলের ম্যানেজমেন্টের কারণেই এ অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ফটিকছড়ি থানা ও ভূজপুর থানা পুলিশের চোখের এই অপরাধ হলেও অদৃশ্য কোন কারণে না দেখার ভান করছে এবং বিষয়টি তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না—এমন বক্তব্য দিয়ে চুপ করে থাকছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, হাতে গোনা কয়েকটি অবৈধ ইটভাটায় দায়সারা অভিযান চালানো হলেও এখনো অর্ধশতাধিক ব্রিক ফিল্ড প্রকাশ্যে অবৈধভাবে গাছের লাকড়ি পোড়াচ্ছে এবং সেসব ভাটার জন্য অবৈধভাবে মাটি কাটা অব্যাহত রয়েছে।
মামলা ও আইনগত জটিলতা এড়াতে অবৈধ মাটি পরিবহনে ব্যবহৃত ট্রাক ও ট্রাক্টর থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে নম্বর প্লেট খুলে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কোথাও আবার নম্বর প্লেট থাকলেও তা কাঁদা ও মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হচ্ছে, যাতে গাড়ি শনাক্ত করা না যায়। এতে একদিকে অবৈধ মাটি কাটার সিন্ডিকেট সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটলেও দায়ী যানবাহন চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। স্থানীয়দের মতে, এভাবে নম্বর প্লেট আড়াল করে রাতভর মাটি পরিবহন একটি সংঘবদ্ধ অপরাধে পরিণত হয়েছে, যা প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে একাধিক আইনের লঙ্ঘন। ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫’ অনুযায়ী পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে মাটি কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। একই সঙ্গে ‘মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩’ অনুসারে কৃষিজমির টপসয়েল অপসারণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এতে জড়িতদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া সড়কে কাদা ফেলে চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’-এর অধীনেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে রাতভিত্তিক যৌথ অভিযান, অবৈধ ট্রাক ও ট্রাক্টর জব্দ, সিন্ডিকেট শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় ফটিকছড়ির কৃষি, পরিবেশ ও সড়ক অবকাঠামো অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট