ঢাকা | বঙ্গাব্দ

যে সাদাছড়ি ছিল সংকোচ আজ সেটিই সাহস

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 15, 2026 ইং
যে সাদাছড়ি ছিল সংকোচ আজ সেটিই সাহস ছবির ক্যাপশন: যে সাদাছড়ি ছিল সংকোচ আজ সেটিই সাহস
ad728
নিউজ ডেস্ক (চট্টগ্রাম)

হাতে সাদাছড়ি নিয়ে হাঁটতে সংকোচ হতো মোহাম্মদ আল আমিনের। মনে হতো, বন্ধুরা কী ভাববে! সবাই স্বাভাবিকভাবে হাঁটছে, আর তাঁকে হাঁটতে হচ্ছে হাতে একটি লাঠি নিয়ে। তাই চোখে না দেখেও সাদাছড়ি ছাড়া চলার চেষ্টা করতেন। কিন্তু পথে গর্তে পড়ে যাওয়া কিংবা ড্রেনে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার আশঙ্কা তাঁকে ভাবিয়ে তুলত। এক সময় বুঝলেন, অন্যের চোখে কেমন দেখাচ্ছে, তার চেয়ে নিরাপদে চলতে পারাটাই বেশি জরুরি।

 

 

সেই উপলব্ধি থেকেই সাদাছড়িকে আপন করে নেওয়া। যে সাদাছড়ি হাতে নিতে একসময় সংকোচ হতো, সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গী। এখন এই ছড়ি হাতেই তিনি ঘুরে বেড়ান এখানে-ওখানে। নিজের যোগ্যতায় পড়ছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে, একই ক্যাম্পাসে গড়েছেন কর্মজীবনও।

 

 

আজ ১৫ অক্টোবর, বিশ্ব সাদাছড়ি নিরাপত্তা দিবস। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদ চলাচল ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। ‘দৃষ্টি যেখানে সীমিত, সম্ভাবনা সেখানে সীমাহীন’-এই প্রতিপাদ্যে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে দিবসটি। তবে, শুধু হাতে সাদাছড়ি তুলে দিলেই কি পথ নিরাপদ হয়? পথচারী, গাড়িচালক ও নগর ব্যবস্থাপনার সচেতনতা ছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের চলাচল কতটা ঝুঁকিমুক্ত? আল আমিনের অভিজ্ঞতায় উঠে আসে সেই প্রশ্নও।

 

 

সাড়ে তিন বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারান আল আমিন। কুমিল্লার দেবিদ্বারের এই তরুণ ছয় ভাই ও তিন বোনের মধ্যে ভাইদের মধ্যে বড়। একসময় পরিবার ভাবতো, হয়তো অন্য ভাইদের ওপর নির্ভর করেই কাটাতে হবে তাঁর জীবন। কিন্তু সেই ধারণা বদলে দিয়েছেন তিনি। ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা করে পেরিয়েছেন শিক্ষাজীবনের নানা বাধা। ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরে টেলিফোন অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন।

 

আল আমিনের শিক্ষাজীবনের শুরুটাও সহজ ছিল না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের পড়াশোনার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে, তা জানত না তাঁর পরিবার। পরে এক চক্ষু চিকিৎসকের মাধ্যমে এ সুযোগের কথা জানতে পারে পরিবার। প্রথমে কুমিল্লায় একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির চেষ্টা করেও আসন পাননি তিনি। এরপর ২০০৮ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রামের মুরাদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে। সেখানেই ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনা শুরু করেন।

 

 

সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত ওই বিদ্যালয়ে পড়ার পর সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন আল আমিন। ২০১৫ সালে মাধ্যমিক এবং ২০১৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। পড়াশোনা শেষের দিকে। এর মধ্যে গত বছরের ৩ আগস্ট যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরে টেলিফোন অপারেটর পদে।

 

 

সাদাছড়ি ব্যবহারের শুরুটা অবশ্য সহজ ছিল না। আল আমিন বলেন, ‘আগে ভাবতাম, বন্ধুরা দেখলে কী মনে করবে! এ কারণে সাদাছড়ি ব্যবহার করতে চাইতাম না। পরে বুঝলাম, বিপদে পড়ার চেয়ে এটি ব্যবহার করাই ভালো।’

 

 

এখন সাদাছড়ি হাতে থাকলে আত্মবিশ্বাস পান আল আমিন। হাঁটার গতি বাড়ে, পথের বাধা সম্পর্কেও আগেভাগে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যরাও বুঝতে পারেন, তাঁর সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে। তবে সাদাছড়ি থাকলেই পথ নিরাপদ হয়ে যায় না। পথচারী ও গাড়িচালকদের অনেকেই এর ব্যবহার সম্পর্কে জানেন না। কখনো গাড়ি বা রিকশা খুব কাছ দিয়ে চলে যায়, তৈরি হয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

 

 

আল আমিনের ভাষায়, ‘অনেকে সাহায্য করেন। আবার অনেকে পাশ দিয়ে চলে গেলেও বুঝতে পারেন না, আমার সহযোগিতা প্রয়োজন। সাদাছড়ি সম্পর্কে মানুষের আরও জানা দরকার। শুধু একটি দিবসে নয়, সারা বছর এ বিষয়ে প্রচার থাকা উচিত।’

 

 

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিয়েও ভাবেন আল আমিন। তাঁর মতে, অনেক পরিবার এখনো জানে না, সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব শিশুর পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে। কোথায় ভর্তি হতে হবে, কখন আবেদন করতে হবে-এসব তথ্যের অভাবে শিশুরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। সরকারি বেতার ও টেলিভিশনে নিয়মিত প্রচারের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে এ বিষয়ে জানানো সম্ভব।

 

 

পরিবারের যে ছেলেটির ভবিষ্যৎ নিয়ে একসময় সংশয় ছিল, সেই আল আমিন আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও কর্মী। পরিবারের অন্য কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পৌঁছাতে না পারলেও নিজের যোগ্যতায় বাধার সব পাহাড় ডিঙিয়েছেন তিনি। আর এই দীর্ঘ পথচলায় তাঁর সঙ্গী সেই সাদাছড়ি-যে ছড়ি একদিন হাতে নিতে সংকোচ হতো, আজ সেটিই তাঁকে সাহস জোগায় নিজের পথে এগিয়ে চলার।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ