গবেষণা ও তথ্যসূত্র: ড. মোহাম্মদ আরশাদ-উল-আলম, সহযোগী অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, চট্টগ্রাম।
হালদা নদী শুধু একটি সাধারণ নদী নয়—এটি বাংলাদেশের দেশীয় বড় কার্প মাছের একমাত্র সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র। এই নদী থেকে আহরিত রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউসের নিষিক্ত ডিম দেশের পোনা উৎপাদন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে হালদা নদীকে বছরব্যাপী মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য মহৎ, কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ব্যবস্থাপনা কি সত্যিই পরিবেশ, মানুষের জীবিকার ও পুষ্টি জন্য সর্বোত্তম?
অভয়াশ্রম ঘোষণার আগে হালদা নদীতে ৩৪ ধরনের মাছ ধরার জাল ও পদ্ধতির ব্যবহার ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং সবচেয়ে বেশি প্রজাতি আহরণকারী জাল ছিল ক্ষুদ্র মেশযুক্ত ঘেরা জাল (বা চরঘেরা জাল, বা ফেন্স নেট)। গবেষণায় দেখা যায়, এই জালে ৬৪ প্রজাতির মাছ এবং ৮ প্রজাতির চিংড়ি ধরা পড়েছে—যা নদীতে ব্যবহৃত অন্য যেকোনো জালের তুলনায় সর্বোচ্চ। অর্থাৎ ঘেরা জাল ছিল অত্যন্ত নন-সিলেক্টিভ; বড়–ছোট, পরিণত–অপরিণত সব ধরনের জলজ প্রাণীই এতে ধরা পড়ত। নন-সিলেক্টিভ প্রকৃতির জন্য বাংলাদেশ সরকার এই জাল প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশব্যাপী নিষিদ্ধ করে।
সহজ প্রাপ্য, সহজে ব্যবহারযোগ্য ও সর্বোপরি এই নন-সিলেক্টিভ বৈশিষ্ট্যই ঘেরা জালকে পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর করে তুলেছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ঘেরা জালের আহরণে সংখ্যার হিসাবে প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং ওজনের হিসাবে প্রায় ৫৭ শতাংশই ছিল চিংড়ি—যার বড় অংশ অপরিণত গলদা চিংড়ি। ক্ষুদ্র মেশের কারণে পোনা মাছ, ছোট মাছ ও ব্রুড ফিশ পর্যন্ত এতে আটকা পড়েছে। এমনকি নদীতীরে ২০০–২৭০ মিটার দীর্ঘ ঘেরা জালের ব্যাপক ব্যবহার মাছের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলেছিল।
তবে এখানেই বিষয়টি শেষ নয়। হালদা নদীর মোট মাছ আহরণে একটি ক্ষুদ্রাকৃতির কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাছ—কাঁচকি—এককভাবে ১২–১৮ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রেখেছে। এই মাছের জীবনকাল স্বল্প, প্রজনন হার বেশি এবং পুষ্টিমান অত্যন্ত উচ্চ। কাঁচকি মাছ সাধারণত মাথাসহ খাওয়া হয়, ফলে ক্যালসিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত যে, এ ধরনের ক্ষুদ্র ও স্বল্পজীবী মাছ অধিক হারে আহরণ করলেও পরিবেশগত ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থাপনায় বছরব্যাপী মাছ ধরা নিষিদ্ধ হওয়ায় এই পুষ্টিকর মাছও আহরণ বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, হালদা নদীর মোট আহরণে মেজর কার্পের অবদান ছিল মাত্র ৯–১৪ শতাংশ। অর্থাৎ যে প্রজাতিগুলোর জন্য পুরো নদী্র মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে, তাদের পরিমাণ মোট উৎপাদনের তুলনায় সীমিত, অথচ নিষেধাজ্ঞার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে সস্তা প্রোটিনের উৎস, কর্মহীন হচ্ছে জেলে সম্প্রদায়, ব্যয় বাড়ছে ব্যবস্থাপনায়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নদীর খাদ্যজাল, এবং তৈরি হচ্ছে অনিয়ম ও দুর্নীতির ঝুঁকি।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—সংরক্ষণ কি অবশ্যই সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমেই করতে হবে?
বিকল্প আছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত—যা দেশীয় বড় কার্প মাছের প্রজনন ও অভিবাসনের মূল সময়—এই সময়টিতে কঠোরভাবে মাছ ধরা বন্ধ রাখা যেতে পারে। বছরের বাকি সময়ে নির্দিষ্ট জাল, নির্দিষ্ট মেশ সাইজ ও নিয়ন্ত্রিত সংখ্যার মাধ্যমে মাছ ধরার সুযোগ দিলে একদিকে যেমন মেজর কার্পের প্রজনন সুরক্ষিত থাকবে, অন্যদিকে তেমনি মানুষের খাদ্য, জীবিকা ও নদীর প্রাকৃতিক উৎপাদনশীলতাও বজায় থাকবে।
হালদা নদীর মতো একটি অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনায় আবেগ নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও অভিযোজিত সিদ্ধান্ত। তাই বর্তমান অভয়াশ্রমের নকশা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ রিভিউ জরুরি। সংরক্ষণ ও ব্যবহার—এই দুইয়ের সমন্বয়ই হতে পারে হালদা নদীর টেকসই ভবিষ্যৎ।

দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট