ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নিরাপদ শহর চাই,কিন্তু দায়িত্ব নেবেন কে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Mar 28, 2026 ইং
নিরাপদ শহর চাই,কিন্তু দায়িত্ব নেবেন কে ছবির ক্যাপশন: মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী
ad728

সম্পাদকীয় বার্তা 

আমরা সবাই একটি নিরাপদ শহর চাই। এমন একটি শহর যেখানে রাতে নির্ভয়ে হাঁটা যাবে, সন্তানকে বাইরে পাঠালে দুশ্চিন্তা থাকবে না, ব্যবসা বা কর্মস্থল শেষে ঘরে ফেরার পথে আতঙ্ক গ্রাস করবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই নিরাপদ শহর গড়ে তোলার দায়িত্ব কি কেবল পুলিশের, প্রশাসনের বা সরকারের? নাকি এই শহরের প্রতিটি নাগরিকেরও কিছু দায় রয়েছে?
বাস্তবতা হলো, আমরা প্রায়ই নিরাপত্তা চাই, কিন্তু সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ব পালনে পিছিয়ে যাই। আমরা চাই অপরাধ কমুক, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো হোক, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক সাহস ও নাগরিক দায়িত্ববোধ অনেক সময় দেখাতে চাই না।
ধরুন, কোনো অপরাধীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেছে। তখন দেখা যায়, অনেকেই সেই আসামিকে ছাড়িয়ে আনার জন্য সুপারিশ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ পরিচিতির দোহাই দেন, কেউ রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। অথচ একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়,আজ যে অপরাধীকে আপনি সুপারিশ করে ছাড়িয়ে নিচ্ছেন, কাল সেই ব্যক্তি হয়তো আবার কোনো নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি করবে। তখন সেই ক্ষতির দায় কি শুধু প্রশাসনের ওপরই বর্তাবে?
একইভাবে আমরা প্রায়ই কোনো অপরাধের ঘটনা নিজের চোখে দেখলেও সাক্ষী হতে চাই না। আদালতে যেতে হবে, সময় নষ্ট হবে, ঝামেলা হবে এই ভয়ে অনেকেই মুখ বন্ধ করে থাকেন। ফলে অপরাধী অনেক সময় আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন আমরা আবার অভিযোগ করি দেশে নাকি বিচার নেই, আইনশৃঙ্খলা নেই।
কিন্তু বিচার প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে সাক্ষ্য ও প্রমাণ। আর সেই সাক্ষ্যের বড় অংশ আসে সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই। যখন মানুষ সাহস করে সত্য কথা বলে না, তখন অপরাধীরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আরেকটি বিষয় হলো আমরা প্রায়ই অন্যের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত ভাবতে চাই। ধরুন, আপনার চোখের সামনে কোনো অপরাধ ঘটছে। একজন মানুষ মারধরের শিকার হচ্ছেন, কারও সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে, কিংবা কোনো দুর্বল মানুষ বিপদে পড়েছে। তখন অনেকেই দূর থেকে দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখেন, কেউ কেউ ভিডিও করেন, কিন্তু এগিয়ে আসেন না। কারণ, ঝামেলায় জড়াতে চান না।
কিন্তু একটি সমাজ তখনই সুস্থ থাকে, যখন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখে। নাগরিক সাহসই একটি শহরকে সত্যিকার অর্থে নিরাপদ করে তোলে।
অবৈধ মোটরসাইকেল কিংবা কাগজপত্রবিহীন গাড়ি আটক করলেও প্রায়ই দেখা যায় কেউ না কেউ এসে সেটি ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিচিতির জোরে বা প্রভাব খাটিয়ে আইনের প্রয়োগকে দুর্বল করা হয়। অথচ এই অবৈধ যানবাহনই অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনা, ছিনতাই কিংবা বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে।
আমরা একদিকে আইন মানার কথা বলি, অন্যদিকে নিজের স্বার্থে সেই আইন ভাঙার পথও খুঁজি। এই দ্বৈত আচরণ আমাদের সমাজকে দুর্বল করে দেয়।
পরিবারের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দেখা যায়, রাত গভীর হলেও পরিবারের কেউ খোঁজ রাখেন না তাদের সন্তান কোথায় আছে, কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে। কৈশোর ও তরুণ বয়স এমন একটি সময়, যখন সঠিক দিকনির্দেশনা না পেলে অনেকেই ভুল পথে চলে যেতে পারে।
একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পরিবারের দায়িত্ব অপরিসীম। সন্তানদের প্রতি নজর রাখা, তাদের বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে জানা, তাদের মানসিক অবস্থার খোঁজ রাখা এসবই অপরাধ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
আমরা প্রায়ই বলি অপরাধ বেড়ে গেছে, সমাজ খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, অপরাধী বলে আলাদা কোনো জাতি নেই। তারা এই সমাজেরই মানুষ। কেউ কারও ছেলে, কেউ কারও ভাই, কেউ কারও বন্ধু। অর্থাৎ, অপরাধীরা কোথাও থেকে আমদানি হয়ে আসে না। তারা আমাদের সমাজ থেকেই তৈরি হয়। তাই সমাজের প্রতিটি মানুষের আচরণ, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধই নির্ধারণ করে সেই সমাজ কতটা নিরাপদ হবে। একটি শহরকে নিরাপদ করতে হলে শুধু কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং নৈতিক শক্তি। যখন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, অপরাধীকে আড়াল করবে না, আইনকে সম্মান করবে তখনই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে।
আমরা যদি সত্যিই নিরাপদ শহর চাই, তাহলে আমাদের নিজেদের আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। থানায় আসামি ছাড়ানোর সুপারিশ না করে বরং আইনকে কাজ করতে দিতে হবে। অপরাধের সাক্ষী হলে সাহস করে সত্য কথা বলতে হবে। অন্যায়ের সামনে নীরব দর্শক হয়ে না থেকে প্রতিবাদ করতে হবে।
সন্তানদের সঠিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ দিতে হবে, তাদের চলাফেরা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। সমাজে আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো অন্যকে দোষারোপ করার আগে নিজের ভেতরে প্রশ্ন করতে হবে। আমরা কি সত্যিই একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের মতো আচরণ করছি?
একটি শহরের নিরাপত্তা শুধু পুলিশের হাতে নয়, সেই শহরের প্রতিটি মানুষের হাতে। যখন নাগরিকরা নিজেদের দায়িত্ব বুঝতে শিখবে, তখনই একটি শহর সত্যিকার অর্থে নিরাপদ হয়ে উঠবে। তাই আজ সময় এসেছে অন্যকে দোষ দেওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করার,আমি কি সত্যিই একটি নিরাপদ শহর গড়ে তোলার জন্য নিজের দায়িত্ব পালন করছি?


নিউজটি পোস্ট করেছেন : দৈনিক চট্টগ্রামপোস্ট

কমেন্ট বক্স
প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন এই তারকারাও

প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন এই তারকারাও